বিষবাষ্প ও বিজ্ঞান – সাম্যজিৎ গাঙ্গুলী

শেয়ার করুন

“বিজ্ঞান যখন প্রেমের গান ভুলে ভাড়াটে জল্লাদের পােশাক গায়ে চাপায়, আর
রাজনীতির বাদশারা পয়সা দিয়ে তার ইজ্জত কিনে নেয়,
আর তার গলা থেকেও ধর্মের ষাঁড়েদের মতােই কর্কশ
আদেশ শােনা যায় : ‘রাস্তা ছাড়াে! নইলে –”

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কবিতাটি প্রিয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। আগের কয়েক পঙ‌্ক্তিতে ধর্মকে কষিয়ে গালি দেওয়া এবং বিজ্ঞানের রীতিমতো সুখ্যাতি করার পর এই বেশ পুরোনো অভিযোগখানা আনা হয়েছে। খুব অপ্রত্যাশিত অভিযোগ না, এই দায় বিজ্ঞানের উপরে আগে অনেকেই চাপিয়েছেন। কিন্তু কথা হল, দিনের শেষে, ‘বিশেষ জ্ঞান’ হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান জ্ঞানই। এবং জ্ঞান হবার দরুনই সে নির্গুণ, তার গুণ বা দোষ তার প্রয়োগে। প্রয়োগ বাদে জ্ঞান নিটোল শূন্য। জ্ঞান থেকে প্রেমের গান খুঁজে পাওয়া বা সেই গানকেই জল্লাদের উল্লাস বানানো—সবই প্রয়োগকারীর হাতে। আর দুঃখের কথা, বিজ্ঞানের প্রয়োগকারীদের নাম বা বদনাম, কেউই টেনে আনে না এ তর্কে। কেন? হয়তো বা বৈজ্ঞানিক হওয়াটা ‘জীবনে কী হতে চাই’ রচনায় লেখার মতো উপযুক্ত বিষয় বলে। বা হয়তো বৈজ্ঞানিকরা মানুষ, তাই তাদের দোষগুণ দুই-ই হয়, এটাই ধরে নেওয়া হয়েছে বলে। দোষ-গুণ সব পেশায় থাকে, যাদের মতো ‘হতে হবে’ তাঁদেরও থাকে। কিন্তু প্রেমের গান গাওয়া বিজ্ঞানসাধকই যখন বিজ্ঞানের ‘ইজ্জত’ বেচে দিয়ে ভাড়াটে জল্লাদ হয়ে যায়? বা শুধু সেটুকুতে থেমে না থেকে জল্লাদগিরির মূল প্রবক্তা হয়ে ওঠে? তখন কি নায়ক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা সঙ্গত হয়ে ওঠে না, অন্তত একবারের জন্যও?

এই কাহিনিতে চরিত্রের ঘনঘটা। নায়ক বাছতে হলে যদিও থাকবেন দুজনই—ফ্রিৎস হেবার আর ভিক্টর গ্রিগনার্ড। নায়কদের থেকে অবশ্যই কোনো অংশে কম যান না পার্শ্বচরিত্ররাও। তাঁরাও অনেক সময় নায়কই হয়ে যান, নিজের নিজের কাহিনিতে। জেমস ফ্রাঙ্ক, গুস্তাব হার্টজ, ওয়াল্টার নার্নস্ট বা ওটো হানরা নিজেরাও নোবেলজয়ী, বিজ্ঞানে প্রভাব হয়তো ওই দুজনের চেয়ে বেশিই। তবুও, এ গল্পে হেবার বা গ্রিগনার্ডকে টপকান না কেউই।
দুজনের সাথেই সেই স্কুলে পরিচয়। স্কুলস্তরে কেমিস্ট্রিতে যে কজন লোক বুক বাজিয়ে বলতে পারেন, ‘নাম তো সুনা হি হোগা’, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে আছেন এই দুজনই। ইলেভেন টুয়েলভের অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ‘রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে যেখানেই বিপদে পড়বে, সেখানেই গ্রিগনার্ডকে স্মরণ করবে’ মার্কা একটা কথা আছে। গ্রিগনার্ড রিয়েজেন্ট প্রকৃত অর্থেই সর্বঘটে কাঁঠালি কলা। হেবারের সঙ্গে পরিচয় আরও খানিকটা আগে, নাইন কি টেনে। Haber-Bosch Process নামে পরিচিত Ammonia তৈরির ইন্ডাস্ট্রিয়াল পদ্ধতিটি বাস্তবজীবনে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার খাতায়ও। ঝুড়ি-ঝুড়ি প্রশ্ন ও ছাক্কা নম্বরের জন্য হেবার সাহেবের কাছে আমার মতো অনেক ছাত্রই সবিশেষ কৃতজ্ঞ। কিন্তু হেবার হোক বা গ্রিগনার্ড বা বাকিদেরও, কাউকেই ঠিক ওইটুকু পাঠ্যবইয়ের ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি বা সাথে জুড়ে দেওয়া নোবেল পুরস্কারজয়ীর তকমাটা দিয়ে মেপে ফেলা যায় না। তাদের বাকি জীবনটাও বর্ণময়, আবার অন্ধকারও—এবং, দুঃখের কথা, প্রদীপের তলার আঁধারটা অজ্ঞানতার নয়, ‘নায়ক’-দের কীর্তিরই। অবশ্য, অন্ধকারটা স্বাভাবিক বোধহয়—যুদ্ধের সাথে যুক্ত কোন্ জিনিসটাই বা আর আলোকিত, উজ্জ্বল হতে পারে?

রাসায়নিক যুদ্ধ—দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, নরমেধ

সেটা ১৯১৪ সাল। হ্যাঁ, যুদ্ধটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু সেই গোটা বিশ্বযুদ্ধের গল্প বলার জন্য এই লেখার অবতারণা নয়, সে ক্ষমতাও আমার নেই। বিষয়বস্তু নেহাতই সীমিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের গণহত্যা, পূর্ব এশিয়ায় জাপানের নৃশংস অত্যাচার বা পরমাণু বিস্ফোরণ—গা শিউরে ওঠার মতো ঘটনার অভাব নেই। সে তুলনায় ঢের পুরোনো, সাবেক ইউরোপীয় রাজশক্তির শেষ যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নারকীয়তা নিয়ে চর্চা বরং কমই—ইতিহাসের উপরে যেন পুরু আস্তরণ পড়ে গেছে রোম্যান্টিসিজমের। কিন্তু তাও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রথম মহাযুদ্ধের নৃশংসতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী, আজও—আর তার সব থেকে ভালো (নাকি, ভয়ঙ্কর বলব?) উদাহরণ সম্ভবত মানবতার ইতিহাসের প্রথম রাসায়নিক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ এবং তার যোদ্ধারাই এই কাহিনির মূলে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বেশ কিছু বছর আগেই তাই রাসায়নিক অস্ত্রের সম্পর্কে চর্চা শুরু হয়। আধুনিক যুগে রাসায়নিক অস্ত্র প্রস্তুতি ও ব্যবহারের প্রথম প্রস্তাব আসে ১৮৫৪তে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময়। প্রস্তাবক ব্রিটেনের তৎকালীন বিজ্ঞান ও শিল্প দফতরের সচিব, লিওন প্লেফেয়ার। প্রস্তাবটি সরকার এবং সেনাবাহিনী নাকচ করলেও প্লেফেয়ার যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা প্রায় অকাট্য—যুগে যুগে অস্ত্র তৈরি হয়েছে মানুষ মারতে, রাসায়নিক অস্ত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। অস্ত্রের কাজ শত্রু নাশ। রাসায়নিক অস্ত্র দ্রুত বেশি শত্রু মারতে পারে, রক্তপাতের নৃশংসতাও নেই, আক্রান্তর মৃত্যুও যন্ত্রণাহীন। তবে সে অস্ত্রে আপত্তি কেন? এক শেষের যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর দাবি বাদে (রাসায়নিক অস্ত্রের প্রভাব সাধারণত বেশ যন্ত্রণাদায়ক, অনেকক্ষেত্রে যন্ত্রণা দিতেই তৈরি, যদিও উলটোটাও করা অসম্ভব না) সবই তো সত্যি। তাও আপত্তি থাকে, হয়তো খানিকটা রক্ষণশীলতার দায়, হয়তো বা misplaced chivalry বা হয়তো খানিকটা মানবিকতা। তাই ১৮৯৯-এর দ্য হেগ কনফারেন্সে রাসায়নিক অস্ত্র বিরোধী প্রস্তাব পাশ হয়, বিরুদ্ধে ভোট কেবল একটিই। ভোটদাতার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিনিধি আলফ্রেড থেয়ার ম্যাহান যুক্তি দিয়েছিলেন, মার্কিনিদের উদ্ভাবনী শক্তিকে আটকানো যাবে না। মার্কিন কেন, কোনো উদ্ভাবনী শক্তিকেই আটকানো যায়নি। পনেরো বছর লেগেছিল মোটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে।

১৯১৪-র ২৮শে জুলাই যুদ্ধ শুরু হবার মাস খানেকের মধ্যেই প্রথম ব্যবহৃত হয় রাসায়নিক অস্ত্র—আগস্টেই ফরাসি সৈন্যবাহিনী ব্যবহার করা শুরু করে কাঁদানে গ্যাস। মনে রাখা ভালো, রাসায়নিক অস্ত্র হলেও কাঁদানে গ্যাস (tear gas) দ্য হেগ কনভেনশনে নিষিদ্ধ হয়নি, কারণ কনভেনশনের রাসায়নিক অস্ত্রের তালিকায় আছে স্রেফ asphyxiant (শ্বাসরোধকারী) ও বিষাক্ত গ্যাস। কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য irritant ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া তখনই। কাঁদানে গ্যাসে শত্রু সৈন্য মরে না বটে, কিন্তু অসুস্থ হয়, অন্ধ অবধি হতে পারে। তাই গোটা বছর জুড়েই প্রায় তার ব্যবহার চলল অবিরত। এতটাই বেশি ব্যবহৃত হয় যে নভেম্বরের মধ্যেই ফ্রান্সের কাঁদানে গ্যাসের স্টক ফুরিয়ে যায়, ব্রোমিনের অভাবে নতুন করে chloroacetone দিয়ে কাঁদানে গ্যাস তৈরি করতে হয় ফরাসিদের। জার্মানরা কাঁদানে গ্যাসের সাথেই নিয়ে আসে lung irritant-ও, ১৯১৪-র অক্টোবরে। তবে ১৯১৪ নেহাতই রাসায়নিক যুদ্ধের শুরুর বছর—বিষাক্ত গ্যাস তখনও এক বছর দূর, দুপক্ষের কাছেই সেটা ‘সভ্য’ যুদ্ধ।

খেলার নিয়ম-কানুন পালটাল পরের বছর, বাইশে এপ্রিল। বেলজিয়ামের ইপ্রেস শহর দখলের যুদ্ধ চলছে। পুব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা হাওয়ার সাথেই ধূসর-সবুজ ধোঁয়ায় ঢেকে গেল ফরাসি ট্রেঞ্চ লাইন—জার্মান বাহিনীর হাত ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে অভিষেক ঘটল ক্লোরিনের। দমবন্ধ হয়ে আসা, সাথে অসহ্য জ্বালা-পোড়া। ক্লোরিন সেদিন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতই। রাসায়নিক অস্ত্রের আক্রমণ হতে পারে, ফরাসি ইন্টেলিজেন্সের কাছে খবর ছিল আগেই। তবুও, উপযুক্ত প্রস্তুতির অভাব। আর সৈন্যরা মূলত আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে আগত। অতএব, অবহেলা আরও বেশি। নিরুপায় ফরাসি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় অল্প সময়েই। নিহত প্রায় হাজার খানেক, আহত চারগুণ। ফরাসি লাইনে বড়ো ফাটল ধরানো সত্ত্বেও জার্মানরা বেশি সুবিধা করতে পারেনি যদিও। গ্যাস আক্রমণ যে ফরাসিদের এমন মারাত্মক ঝটকা দেবে, সেটা আন্দাজ করে উঠতে পারেননি জার্মান হাই কম্যান্ডের কর্তারা।
প্রথমবার অপ্রত্যাশিত সাফল্যের সুফল নিতে না পারলেও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে জার্মানরা এগিয়ে ছিল বেশ খানিকটা, অন্তত শুরুর দিকে। তার পিছনে জার্মান ভারী শিল্পের ভূমিকা যেমন ছিল, তেমনই ছিল জার্মান বৈজ্ঞানিকদেরও, ছিল ফ্রিৎস হেবারের। গ্যাস যুদ্ধের জন্য তৈরি স্পেশাল ইউনিট, পাইওনিয়ার রেজিমেন্ট ৩৫ ও ৩৬-এর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন হেবার। হান, হার্টজ, ফ্রাঙ্ক-এর মতো ভবিষ্যতে নোবেলজয়ী বৈজ্ঞানিকদের নিয়োগ করাটা তাঁরই পরামর্শে। বস্তুত, রাসায়নিক যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তিই হয়ে ওঠে বার্লিনের কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউট। যুদ্ধের শেষ দিকে সামরিক কাজে নিযুক্ত জার্মান রসায়নবিদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় হাজার দুয়েক, ফ্রান্স-ব্রিটেনের সম্মিলিত সংখ্যারও কয়েক গুণ। যুদ্ধ মন্ত্রকের রসায়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর হেবারেরই সিদ্ধান্তে নার্নস্ট-এর উপদেশ মতো টিয়ার গ্যাসের পরিবর্তে ক্লোরিন ব্যবহার করা হয় প্রথম। সেই ২২শে এপ্রিল, ১৯১৫, যুদ্ধে ক্লোরিনের প্রথম প্রয়োগ—সেদিন হেবার নিজেই উপস্থিত ছিলেন ইপ্রেসের ফ্রন্টলাইনে, নিজের আবিষ্কারের প্রভাব স্বচক্ষে দেখতে। হেবার নিজের কৃতকর্মে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন কিনা তা অজ্ঞাত, কিন্তু তাঁর ‘দর’ সেদিনই বেড়ে গিয়েছিল সেনার বড়োকর্তাদের চোখে। পঁচিশ বছর আগে বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিসের সময় অধরা ক্যাপ্টেনের খেতাবটা এনে দেয় রাসায়নিক যুদ্ধ। আবার ১৯১৭-তে তাঁর নেতৃত্বেই তৈরি হয় মাস্টার্ড গ্যাস। রংবিহীন বাষ্প, ঠান্ডা হলে হলুদ তৈলাক্ত তরল। ক্লোরিনের মতো asphyxiant নয়, বরং vesicant—অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক ও internal organs পুড়িয়ে ফোস্কা ফেলে দেয়। সঙ্গে internal haemorrhage এবং তীব্র যন্ত্রণা। মৃত্যু দ্রুত আসে না, অধিকাংশ সময় হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তি মরেই না। কিন্তু জীবন্ত নরকবাস হয়ে যায় একবার mustard gas ফুসফুসে প্রবেশ করলে। আর তাই, তেমন মারণ অস্ত্র না হলেও ফ্রন্টে বিপুল ভীতি সৃষ্টিকারী বিষ বাষ্পটির নাম হয়ে যায় ‘king of gases’।

জার্মানির তুলনায় বেশ কিছুটা দেরিতে শুরু করে বরং ফ্রান্স ও ব্রিটেন। আগেই বলেছি, ইপ্রেসে ফরাসিরা ছিল লজ্জাজনকভাবে অপ্রস্তুত। অথচ গ্যাস হামলা যে হতে পারে, সেটা তারা জানত না এমন নয়। ইপ্রেসের আগে দুই জার্মান সৈনিক ফরাসিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে, বলে গ্যাস আক্রমণের কথা, নিজেদের গ্যাস মাস্কও দেখায়, তবুও, কর্তাদের টনক নড়েনি। জেনারেল মরিস বালফুরিয়ের উলটে বলেন, ‘nonsense’। তবে ইংরেজরা যত বদনাম করে, ফরাসিদের হাল ততটাও বাজে ছিল না। মনে রাখা ভালো, ফরাসিরাই প্রথম রাসায়নিক অস্ত্রকে আনে যুদ্ধের ময়দানে, কাঁদানে গ্যাস হিসেবে। শ্বাসরোধকারী (asphyxiating) গ্যাসের শেল ব্যবহার করাটাও ফরাসিদেরই আবিষ্কার। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে গতি পেতে তাদের খুব বেশি দেরি হয়নি। যুদ্ধ মন্ত্রী আলেকজান্ডার মিলেরঁর নির্দেশে প্যারিস মিউনিসিপ্যাল ল্যাবরেটরির প্রধান আন্দ্রে ক্লিং-এর নেতৃত্বে প্রথম শুরু হয় বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে গবেষণা। প্রথম কাজ গ্যাস থেকে বাঁচার উপায় তৈরি করা। একেবারে শুরুর দিকে ফরাসি গ্যাস মাস্কগুলো তৈরি হয়, তা ছিল খনিতে ব্যবহৃত মাস্কের আদলে। মন্দ না হলেও, গুণমানে জার্মান বা ব্রিটিশদের সাথে তখনও তুলনীয় নয় এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো। সমস্যার সহজ সমাধান করে ফরাসি জেনারেল কমান্ড—নিজস্ব মাস্ক তৈরির বদলে সমস্তটাই হয়ে যায় ব্রিটেন থেকে আমদানি করা। ব্রিটিশ মাস্কগুলো তৈরি হত সুতির কাপড়কে sodium thiosulphate এ চুবিয়ে, ফরাসি মাস্কের মতোই। পার্থক্য বলতে ব্রিটিশ মাস্কগুলো আকারে বড়ো এবং এর সঠিক ব্যবহারের পন্থাটি অভিনব। মাস্ক ব্যবহারের আগে তার উপরে প্রস্রাব করতে হতো সৈন্যদের—মূত্রের আর্দ্রতা এবং অ্যামোনিয়া ক্লোরিনকে রোধ করতে সাহায্য করত।

ক্লোরিনকে আক্রমণের অস্ত্র করার পথটা ফরাসিদের পক্ষে সোজা ছিল না, তার প্রধান কারণ দেশে দেশে তৈরি ক্লোরিনের অভাব। এমনকি ফ্রান্সের মাটিতে একমাত্র ক্লোরিন কারখানাটিও তখন জার্মান মালিকানায়। তাও, ১৯১৫-র মে মাসে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জুনেই গ্যাস ব্যবহার করে ফ্রেঞ্চ আর্মি, প্রথম জার্মান আক্রমণের দু’মাসের মধ্যেই। ফরাসি গবেষণায় গ্যাস শেলে ব্যবহার করার উপযুক্ত হিসেবে উঠে আসে কার্বন ডাই সালফাইড এবং ফসফরাসের মিশ্রণ। এই মিশ্রণটি শুধু বিষাক্তই নয়, ভীষণরকম দাহ্যও বটে। প্রথম গ্যাস শেল ব্যবহৃত হয় ১৬ জুন, ১৯১৫-এ, উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রে। ফরাসিদের হিসেবে পুরোপুরি আশা পূরণ না করলেও, যথেষ্ট কার্যকরীই হয়েছিল সেই গ্যাস আক্রমণ। কার্যকারিতা আরও বাড়ল আরেকটি লোকের প্রবেশের পর।

যুদ্ধের শুরুতে ভিক্টর গ্রিগনার্ড যোগ দিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ আর্মির কর্পোরাল হিসেবে। প্রথম বেশ কিছুদিন তাঁর কাজ ছিল মিলিটারি ক্যাম্পে প্রহরী বা সেন্ট্রি হিসেবে। পরে লেজিওঁ দ‍্য’নর-এর মেডেল গলায় ঝোলানো নোবেলজয়ী বৈজ্ঞানিকটিকে জেনারেল স্টাফ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে ল্যাবরেটরিতে এবং বদলে যায় রাসায়নিক যুদ্ধের ইতিহাস। প্রথমে ন্যান্সিতে কাজ শুরু করেন গ্রিগনার্ড, পরে প্যারিসে। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ সে সময় সামরিক বাহিনীর হাতে। গ্রিগনার্ড এবং তাঁর সহকারীদের হাতেই ১৯১৫-র শেষ দিকে অস্ত্র হিসেবে পুনর্জন্ম হল জন ডেভির আবিষ্কৃত গ্যাস ফসজিন (phosgene)-এর। ফসজিন চিহ্নিত করা বেশ কঠিন, ফলাফল দেখা যায় গ্যাস প্রয়োগের বেশ খানিকটা পরে। কিন্তু মারণ ক্ষমতা ক্লোরিনের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ক্লোরিন বা মাস্টার্ড গ্যাসের মতো অত কুখ্যাত না হলেও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গ্যাস আক্রমণের বলি নব্বই হাজার সৈন্যের আশি শতাংশেরও বেশি ফসজিনেরই শিকার।

আমেরিকান বা ব্রিটিশ রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও গবেষণায় দুই দেশই এগিয়ে গেছিল বেশ খানিকটা। আগেই বলেছি, গ্যাস মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা তুলনামূলক এগিয়েছিল ফরাসিদের চেয়ে। ইপ্রেসের যুদ্ধেই প্রথম গ্যাস আক্রমণের দিন দুয়েকের মধ্যেই একটা মোটামুটি গ্যাস প্রতিরোধকারী ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলেন কানাডিয়ান সৈন্যরা, সার্জেন্ট হ্যারি নোবেলের বুদ্ধিতে। জর্জ পলিট, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের রসায়নবিদ, ভিজে কাপড় ব্যবহারের কথা প্রথম বলেন গ্যাস আটকাতে। এরপরেই একখানা মোক্ষম ভুল করে বসছিল ব্রিটিশ বাহিনী। চার্চিলের উপদেশ মতো ওয়ার অফিস সিদ্ধান্ত নেয় ভিজে পশমের মাস্ক ব্যবহার করার। জন স্কট হ্যালডেন (বাঙালির অতিপরিচিত জেবিএস হ্যালডেনের পিতা) না আটকালে সে যাত্রায় বড় খেসারত দিতে হতো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে—ভিজে পশমের মাস্কে গ্যাস আটকায় না, উলটে ব্যবহারকারীরই দম আটকে যায়। হ্যালডেনের নিজের স্টপ গ্যাপ সলিউশন, ভেজা ন্যাকরায় মাটি ভরে ব্যবহার করা যদিও বিশেষ ভরসা দেয়নি সৈন্যদের। বরং প্রথম ঠিকঠাক গ্যাস মাস্ক তৈরি করেন ইমপিরিয়াল কলেজের হারবার্ট বেকার, জার্মান যুদ্ধবন্দিদের মাস্কের উপরে ভিত্তি করে। পরে এই মাস্কই হয়ে ওঠে গোটা যুদ্ধের স্ট্যান্ডার্ড। আবার একই সাথে পশ্চিমি শক্তিদের মধ্যে ব্রিটেনই কিন্তু প্রথম বড়ো আকারে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে, Loos এর যুদ্ধে। যদিও খুব একটা সফল হয়নি সেই প্রচেষ্টা। যুদ্ধের শেষদিকে মাঠে নামা আমেরিকানরাও মাস্টার্ড গ্যাসের মতো আরেকটি vesicant প্রস্তুত করে, নাম লুইসাইট। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর সেটা ব্যবহার করা হয়ে ওঠেনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় একটি প্রধান সমস্যা দেখা যায়, সব আলোচনাই বড্ড ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট কেন্দ্রিক। ইস্টার্ন ফ্রন্ট এবং মধ্যপ্রাচ্য চিরকালই অবহেলিত। রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে যা চর্চা হয়, তাও মূলত ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট নিয়েই। এমনিতে সেটা খুব একটা অযৌক্তিক নয়—রুশ, অস্ট্রিয়ান, বুলগেরিয়ান, সার্বিয়ান বা তুর্কি সৈন্যবাহিনীর গ্যাস ব্যবহার ছিল সীমিত। জার্মান বা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতেই যেটুকু ব্যবহার হয়েছে রাসায়নিক অস্ত্রের। রাশিয়া বার দুয়েক বিষাক্ত গ্যাসে জগৎ অন্ধকার করে দেবার হুমকি দিলেও কাজে করে দেখাতে পারেনি প্রায় কিছুই, উলটে উপযুক্ত গ্যাস-প্রতিরোধ ব্যবস্থার অভাবে রুশ সেনাবাহিনীর হাল হয় সঙ্গীন। তবুও এর মধ্যেই একটা ল্যান্ডমার্ক হয়ে থেকে যাবে Osowiec কেল্লার যুদ্ধ, যা এখন Attack of the Dead Men নামে পরিচিত। হাজার আটেক জার্মান সৈন্যের বিরুদ্ধে কেল্লা রক্ষা করে হাজারেরও কম রুশ সৈন্য, যাদের মধ্যে অধিকাংশই মিলিশিয়া (অর্থাৎ অস্ত্রধারী জনতা)। গ্যাস আক্রমণে দম আটকে আসছে, গ্যাস-দগ্ধ ফুসফুসের রক্ত মুখ থেকে ঝরছে অবিরত। তাও অদম্য জেদের জোরেই কার্যত টিকে যায় রাশিয়ানরা। টিকে যাওয়া কথাটা অবশ্য বলা মুশকিল এখানে, যুদ্ধ শেষে একশো জনেরও কমের দেহে ছিল প্রাণের স্পন্দন। জীবিতরাও ছিল জিন্দা লাশ।

গোটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রের কারণে মৃত সৈন্যের সংখ্যা নব্বই হাজারের কাছাকাছি, তার মধ্যে সিংহভাগই (প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার) রুশদের। আহত এবং অসুস্থ আরও বারো লক্ষ। Civilian casualty-র হিসেব নেই ঠিকঠাক, তবু বিশ্বাস করা হয় সংখ্যাটা দশ হাজারের বেশিই। সংখ্যাগুলো বড়ো, আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় ততটাও বড়ো নয়। কিন্তু স্রেফ নিহত এবং আহতের সংখ্যা দিয়ে রাসায়নিক যুদ্ধের বিচার করতে বসলে বড়ো ভুল হয়ে যাবে। বিষাক্ত গ্যাস আক্রমণ যে পরিমাণ ভীতির সৃষ্টি করেছিল সৈন্য ও জনতার মধ্যে, তা স্রেফ মৃতের সংখ্যা দিয়ে আন্দাজ করা যায় না। গ্যাস আক্রমণে মৃত্যু যন্ত্রণার, বেঁচে থাকা আরও যন্ত্রণার। সে আতঙ্ক ধরা পড়ে উইলফ্রেড আওয়েনের কবিতায়:

“Gas! Gas! Quick, boys!—An ecstasy of fumbling, Fitting the clumsy helmets just in time;

But someone still was yelling out and stumbling, And flound’ring like a man on fire or lime…

Dim, through the misty panes and thick green light, As under a green sea, I saw him drowning…

In all my dreams before my helpless sight
He plunges at me, guttering, choking, drowning.”

কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কবিতা। কবি যখন লিখেছেন, তাঁর বয়স খুব বেশি না, সদ্য কুড়ি পেরিয়েছেন। কিন্তু বেরিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর। যুদ্ধের শেষ সপ্তাহে উইলফ্রেড আওয়েনও শেষ হয়ে গেছিলেন।
গ্যাস-ভীতি সম্পর্কে আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি রিপোর্ট ছিল খানিকটা এরকম:

‘[S]omeone yelled “GAS!” and said their food had been gassed. All the men were seized with gas fright and a few minutes later made their way to the Aid Station… They came in in stooping posture, holding their abdomens and complaining of pains in the stomach, while their faces bore anxious, frightened expressions and some had even vomited.’

এই সৈন্যদের সুস্থ হতে অবশ্য কোনো ওষুধ লাগেনি, লেগেছিল ‘আশ্বাস’। কারণ শারীরিক কষ্টের প্রধান কারণ ছিল গ্যাস-আতঙ্ক। আদতে তারা কোনো রাসায়নিক অস্ত্রে আক্রান্ত হয়নি। স্রেফ ভয়েই এই হাল। হ্যাঁ, মৃত্যু, মৃত্যুভয় ও নরক যন্ত্রণা—এরকমই ছিল গ্যাস-আক্রমণের পরে ফ্রন্ট লাইনের অবস্থা।

এ আতঙ্কের ছাপ সহজে যাবার নয়। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় গোটা ইউরোপেই রাসায়নিক অস্ত্র হয়ে ওঠে একটি ঘৃণার বস্তু। স্বয়ং হিটলারেরও নাকি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে ছিল চূড়ান্ত অনীহা। নিজে গ্যাস আক্রমণের শিকার হবার পর থেকেই তাঁর এই নিয়ে ছিল চূড়ান্ত ভীতি। ফলত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কিন্তু সেরকম বিপুল হারে রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগ দেখা যায় না। যেটুকু হয়েছে, তা নেহাতই সীমিত। তা বলে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার বা তা নিয়ে গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়নি কোনোমতেই। প্রয়োগ হয়েছে কেবল ইউরোপীয় উপনিবেশ, তৃতীয় বিশ্ব বা বিভিন্ন ‘অসভ্য’ জাতিদের উপর। বিশ্বযুদ্ধের কদিনের মধ্যেই রুশ গৃহযুদ্ধে শ্বেত বাহিনীর সমর্থনে কমিউনিস্টদের উপরে গ্যাস ব্যবহার করেছে ব্রিটিশরা। ফরাসিরা ব্যবহার করেছে মরক্কোর আরবদের বিদ্রোহ থামাতে। ইথিওপিয়া দখল করার সময় গ্যাসের ব্যবহার করেছে ইতালি। আর হিটলারের গ্যাস চেম্বার এবং ফাইনাল সলিউশন তো আছেই। অবশ্য, এরা সবই তো ‘সভ্যতার শত্রু’, এদের বিরুদ্ধে যে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহৃত হবে এতে আর আশ্চর্য কী!

হয়তো খানিকটা আশ্চর্য হবার জায়গা থাকে প্রায় প্রত্যেক দেশের academia-র এই রাসায়নিক যুদ্ধে পুরোদমে involved হয়ে যাওয়ায়। শত হলেও, দেশের সব বৈজ্ঞানিকই প্রায় যুদ্ধের কাজে নিযুক্ত, এটা প্রথমবার বটে। তবে এর পরের সমরাস্ত্রের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, বিজ্ঞানের সামরিকীকরণের ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ aberration নয়, ট্রেন্ডসেটার বরং।

… এবং ফ্রিৎস হেবার

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, এবং বিশেষত রাসায়নিক যুদ্ধে, এত বৈজ্ঞানিক যুক্ত থাকলেও, নাম (এবং বদনাম) কিন্তু হয় একজনেরই—তিনি ফ্রিৎস হেবার। প্রবন্ধের শুরুতে বলেছিলাম, এই রাসায়নিক যুদ্ধের কাহিনির নায়ক দুজন—গ্রিগনার্ড এবং হেবার। আরেকবার ভাবতে বসলে, গ্রিগনার্ডকেও বাদ দিতে হবে হয়তো। যতই সাধারণ কর্পোরেল থেকে ফরাসি রাসায়নিক প্রকল্পের প্রধান কর্তা হয়ে উঠুন না কেন, হেবারের প্রভাবকে টেক্কা দেবার ক্ষমতা তাঁর নেই। ‘রাসায়নিক যুদ্ধের পিতা’ একজনই, তিনি ফ্রিৎস হেবার। কিন্তু হেবার, বা তাঁর অবদান, কোনোটাই স্রেফ সেটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক। তিনি বিষ বাষ্পের জনক। এবং অবশ্যই, অনেকাংশে তিনি গ্যেটের ফস্টও।

ফ্রিৎস হেবারের প্রভাবটা বুঝতে গেলে তাঁরই পুত্র লুডউইগ ফ্রিৎস হেবারের ‘The Poisonous Cloud— Chemical Warfare in the First World War’ বইটার ভূমিকায় বর্ণিত একটি ঘটনাই যথেষ্ট। সেটা ১৯৬৮ সাল। কার্লসরু বিশ্ববিদ্যালয়ে উদযাপিত হচ্ছে ফ্রিৎস হেবারের জন্মশতবার্ষিকী। মঞ্চে বক্তব্য রাখছেন জনৈক বক্তা। হঠাৎ ঢুকে আসে দুই তরুণ, হাতে ব্যানার। ব্যানারের উপরে লেখা ‘হত্যাকারীর জন্য উদযাপন! হেবার গ্যাসযুদ্ধের জনক’। প্রথম কিছুক্ষণ বিস্মিত নীরবতা। তারপর সভাপতির ভাষণ, খানিকটা শান্তি ফেরাবার চেষ্টা। তারপর প্রতিবাদী যুবকদের শান্তিপূর্ণ প্রস্থান। বক্তা আবার মঞ্চে ফিরে নিজের কথা শেষ করেন। হয়তো সেভাবে দেখলে তেমন কিছু নয়, সে সময় ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে উত্তাল, সেই বিদ্রোহেরই এক ক্ষুদ্র অংশ হয়তো। কিন্তু মনে রাখার, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্ধ শতাব্দী তখন গতপ্রায়। মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গেছে, জার্মানিতে নাৎসি শাসন গেছে। প্রতিবাদের আরও অনেক বিষয় আছে, রাগ দেখাবার মতো আরও অনেক ব্যক্তিও আছেন। তাও, রাসায়নিক যুদ্ধের প্রতি তীব্র আক্রোশ কমেনি। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন লুডউইগ ফ্রিৎসও। সেই খোঁজেরই ফলশ্রুতি তাঁর উপরিউক্ত প্রামাণ্য বইটি। ফ্রিৎস হেবারকে চিনতে হলে আরও অনেক কিছুর সাথেই এই বইটাও একান্ত জরুরি।

১৮৬৮ সালের ৯ই ডিসেম্বর হেবারের জন্ম তৎকালীন জার্মানির (বর্তমানে পোল্যান্ডে) শহরের ধনবান ইহুদি পরিবারে। বাবা সিগফ্রিড হেবারের ব্যবসা ছিল রং এবং ওষুধের। মা পাউলা ছেলের জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যেই মারা যান। বাবার সঙ্গেও ফ্রিৎসের সম্পর্ক কোনোকালেই খুব একটা ঘনিষ্ঠ হয়নি। বরং সৎ মা হেডউইগের কাছেই বড়ো হন ফ্রিৎস। ধর্মে ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও হেবার পরিবার ছিল জার্মান সমাজের মূলস্রোতের অঙ্গ, জার্মান আত্মপরিচয় এবং জাতীয়তাবাদ ছোটোবেলা থেকেই গেঁথে গেছিল শিশু ফ্রিৎস হেবারের মনে।

ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র হেবার ব্রেসলাউতে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৮৮৬-তে কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হন বার্লিনের ফ্রেডরিখ উইলহেল্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে চলে যান হাইডেলবার্গে, রবার্ট বুনসেনের ছাত্র হয়ে। মাঝে একবার সেনায় যোগ দেওয়া এবং সাথে আরও বার দুয়েক হাইডেলবার্গ-বার্লিন করার পর অবশেষে কার্ল লিবারম্যানের তত্ত্বাবধানে ১৮৯১-এর মে মাসে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট লাভ করেন। কিন্তু তারপর ব্রেসলাউতে ফিরে এসে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিলেও সেখানে মানিয়ে নিতে পারেননি। ফিরে যেতে বাধ্য হন ইউনিভার্সিটিতে।

ব্রেসলাউ ছাড়ার পর হেবার প্রথমে যোগ দেন জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তারপর কার্লসরুতে। একাধিক বিষয়ে গবেষণার সাথে যুক্ত হন, প্রত্যেকটিতেই কিছু না কিছু অবদান রাখেন। অর্গানিক, ইনর্গানিক এবং ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি—একই সাথে তিনটি শাখায় এভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা, তাও একেবারে গবেষক জীবনের শুরুর দিকে, এমন আরেকটি উদাহরণ সত্যিই বিরল। এই সময়ই হেবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রসায়নে ব্রেসলাউ বিশ্ববিদ্যালয় তথা জার্মানির প্রথম ডক্টরেট খেতাবধারী মহিলা গবেষক ক্লারা ইমেরওয়ারের সাথে।

কার্লসরুতে থাকাকালীনই হেবার হাত দেন তাঁর যুগান্তকারী কাজে—তিনি ammonia তৈরি করার চেষ্টা করেন বাতাসের নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন ব্যবহার করে। এর আগে ammonia-র উৎস ছিল দুর্লভ খনিজ, দাম অতিরিক্ত বেশি। বাতাসের নাইট্রোজেন থেকে ammonia তৈরি করা গেলে এক ধাক্কায় অনেক খরচ কমতে বাধ্য। প্রথমে সহকারী রবার্ট লে রোসিনোলের সাহায্যে একটি মোটামুটি পদ্ধতি তৈরি করেন হেবার। পরে সেটাকেই আরেক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল বস্ক-এর সাহায্যে আরেকটু শুধরে নিয়ে তৈরি হল হেবার-বস্ক প্রসেস। দুর্মূল্য ammonia হয়ে গেল ভীষণই সস্তা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রসায়নের জগতে হওয়া কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম নয়, একেবারে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা হেবারের এই আবিষ্কারটি। Ammonia সহজলভ্য হবার ফলে চাষের সার তৈরি সস্তা হয়ে যায়, কৃষি বিপ্লবের ফলে দ্রুত বাড়ে দেশগুলোর খাদ্য যোগান দেবার ক্ষমতা। এড়ানো যায় দুর্ভিক্ষ, বৃদ্ধি ঘটে জনসংখ্যার। বস্তুত, পালটে যায় পৃথিবীর demographic map। আবার যে ammonia (এবং তার থেকে তৈরি হওয়া নাইট্রেট) ব্যবহার হয় সার তৈরিতে, তারই প্রয়োজন বিস্ফোরক নির্মাণে। টিএনটি, টিএনজি-র মতো বিস্ফোরক তৈরি সম্ভব হত না হেবার-বস্ক প্রসেস না থাকলে।

১৯১১-তে হেবার যোগ দেন বার্লিনের ‘কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি এন্ড ইলেক্ট্রো-কেমিস্ট্রি’-তে। টানা প্রায় বাইশ বছর যুক্ত ছিলেন এখানেই। ১৯১৮-র নোবেলজয়, তারপরে বর্ন-হেবার সাইকেলের আবিষ্কার, সবই এই ইনস্টিটিউটেই। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ছেদ পড়েনি তাঁর কাজে। রাসায়নিক যুদ্ধ হেবারের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে হয়তো খানিক, কিন্তু তাকে বিজ্ঞানবিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর কিছু আগে থেকেই ইউরোপে চলছিল জাতীয়তাবাদের জোয়ার—ফ্রিৎস হেবারও গা ভাসিয়েছিলেন তাতে। যুদ্ধের শুরু থেকেই যে কয়জন জার্মান বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-বিজ্ঞানীরা ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদের বড়ো সমর্থক, হেবার তাঁদের অন্যতম। তাঁর একটি উক্তিতেই অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য যথেষ্ট, ‘বিজ্ঞানী শান্তির সময় বিশ্বের, যুদ্ধের সময় দেশের’। আদি জাতীয়তাবাদী যুক্তি। এর বিরুদ্ধে বলা যেতেই পারে, ‘দেশ কী?’ ‘দেশের স্বার্থ কী?’ ‘দেশ আর রাষ্ট্র, দেশকে সমর্থন করা আর রাষ্ট্রকে সমর্থন করা—এগুলো কি এক জিনিস?’ কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যক্তি জানেন, মাথায় একবার এই জাতীয়তাবাদ গেঁথে গেলে একগাদা প্রশ্ন, যুক্তি সবই ব্যর্থ এদের সামনে। ৪ঠা অক্টোবর, ১৯১৪-তে বেরোয় জার্মানির তিরানব্বইজন বাঘা-বাঘা বৈজ্ঞানিক, অধ্যাপক, সাহিত্যিকদের সই করা যুদ্ধের সমর্থনে লেখা একটি চিঠি, যা বর্তমানে ‘Manifesto of the Ninety-Three’ নামে পরিচিত। সাক্ষরকারীদের তালিকায় নামগুলো চমকপ্রদ—এডলফ বেয়ার, পল এরলিখ, এমিল ফিশার, আর্নস্ট হেকেল, ওয়াল্টার নার্নস্ট, উইলহেলম ওসওয়াল্ড, উইলেম রোন্টজেন, ম্যাক্স প্ল্যাংক। এই ডিক্লারেশনটির অন্যতম উদ্যোক্তাও হেবার। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য নাম তালিকায় অনুপস্থিত। তিনি অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

আইনস্টাইন ও হেবারের জীবনে মিল যেমন প্রভূত, তেমনই বৈপরীত্যও কম নয়। দুজনেই জার্মান ইহুদি, পারিবারিক অবস্থানও মোটামুটি একইরকম। পদার্থবিজ্ঞানে আইনস্টাইনের অবদানের মতোই রসায়নে হেবারের অবদানও কম কিছু নয়। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল দীর্ঘদিনব্যাপী—আইনস্টাইন বার্লিনের কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউটে গবেষণা করতে আসেন হেবারেরই আমন্ত্রণে। আবার দুজনকে ভিন্ন মেরুতে দাঁড় করিয়ে দেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রক্ষণশীল হেবারের উগ্র জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের জিগিরের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রী আইনস্টাইনের আন্তর্জাতিকতাবাদী শান্তির বার্তা।
যখন হেবার ব্যস্ত রাসায়নিক যুদ্ধে, তখন আইনস্টাইন সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ-বিরোধী। বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিসে যোগ দেননি, উলটে ‘Manifesto of the Ninety-Three’-র পাল্টা একটা শান্তিকামী ম্যানিফেস্টোতে সই করেন। সেদিন সর্বগ্রাসী যুদ্ধের মধ্যে শান্তির পক্ষে সাক্ষর ছিল মোটে চারটি। প্রত্যেককেই সম্মুখীন হতে হয় রাষ্ট্রীয় বিষনজরের। অন্যতম রচয়িতা জর্জ ফ্রেডরিখ নিকোলাইয়ের স্থান হয় কারাগারে। আইনস্টাইনকে কোনোমতে বাঁচিয়ে দেয় তার সুইস নাগরিকত্ব।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য ভেস্তে যায় আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্বের হাতে-কলমে প্রমাণ জোগাড় করার প্রথম প্রচেষ্টা। রুশ-জার্মান যুদ্ধ শুরু হতেই রাশিয়ায় কাজ করতে যাওয়া জার্মান বিজ্ঞানী দল বন্দি হয়, এক্সপেরিমেন্ট তখন সুদূর নীহারিকা। প্রমাণ তাও জোগাড় হয়, যুদ্ধ শেষ হবার এক বছর পরে। প্রমাণ দেন ‘শত্রুপক্ষ’ ব্রিটেনের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন। তার জন্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকেও। ধর্মে কোয়েকার, যুদ্ধবিরোধী এডিংটন এক্সপেরিমেন্টের অজুহাতে conscription এড়াতে চেষ্টা করেন। প্রথমে একবার সফল হন, কিন্তু তারপর মামলার সম্মুখীন হতে হয়। তাও, মত বদলাননি। আইনস্টাইনের মতোই যুদ্ধে যাননি আর্থার এডিংটনও। না, তাঁরা হয়তো দেশের হয়ে উঠতে পারেননি ঠিকমতো, তাঁদের আনুগত্যটা বিজ্ঞানের প্রতিই থেকে গিয়েছিল চিরকাল।

রাসায়নিক যুদ্ধের ভার হেবারের পক্ষে ছিল যেমন শ্রমসাধ্য, তেমনই ছিল আর্থিক দিক থেকে ভীষণ লাভজনক। শুধু অর্থ নয়, প্রতিপত্তিও। সেনা এবং অভিজাতমহল, দু’জায়গাতেই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাঁর। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই স্থির হয় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের নীতি। কিন্তু এই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হেবারকে অনেক কিছু দেবার সাথে সাথেই, কেড়েও নিয়েছে। অর্থ-ক্ষমতা হয়তো হেবার পেয়েছেন, কিন্তু পারিবারিক জীবনে শান্তি পাননি।

হেবারের স্ত্রী ক্লারা ইমেরওয়ার নিজে ছিলেন বিজ্ঞানের প্রতিভাময়ী ছাত্রী, নারীমুক্তি আন্দোলনের কর্মী। সময়টা অন্যরকম হলে হয়তো ক্লারা নিজেও স্মরণীয় হতেন বিজ্ঞানী হিসেবে। কিন্তু রক্ষণশীল জার্মান সমাজে বিবাহের পর তাঁর স্থান হয় অন্তঃপুরে। স্বাধীনচেতা ক্লারা কোনোদিনই মেনে নিতে পারেননি সেটা। সময় যত গড়িয়েছে, তত অবনতি ঘটেছে অর্থ-ক্ষমতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদে অন্ধ ফ্রিৎস এবং একাকীত্ব ও অবসাদে ভোগা ক্লারার সম্পর্কের। রাসায়নিক যুদ্ধ সেই সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক হয়ে দাঁড়াল।

২২শে এপ্রিল, ইপ্রেসের যুদ্ধে ফরাসিদের জন্য মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে দেখা দিল ক্লোরিন। এবং জার্মান অভিজাত সমাজে রাতারাতি যুদ্ধজয়ী নায়ক হয়ে উঠলেন হেবার। যুদ্ধবিরোধী ক্লারা কিন্তু স্বামীর এই কীর্তিটি হজম করতে পারেননি। বললেন, রাসায়নিক অস্ত্র হল, “perversion of the ideals of science, a sign of barbarity, corrupting the very discipline which ought to bring new insights into life”। বেলজিয়াম থেকে হেবারের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বার্লিনে জমকালো পার্টির আয়োজন হল পয়লা মে’তে। সেখানেই বাদানুবাদ গড়াল প্রবল অশান্তিতে। ভোর রাতে ফ্রিৎসের মিলিটারি রিভলভারের বুলেটকেই মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিলেন ক্লারা। পরের দিন সকালে যুদ্ধজয়ের আশায়, আরও খ্যাতির আশায় ফ্রিৎস হেবার চলে গেলেন পূর্ব ফ্রন্টে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাস আক্রমণে নেতৃত্ব দিতে। রসায়নে জার্মানির প্রথম মহিলা ডক্টরেটের জন্য বরাদ্দ হল ছ’দিন বাদে Grunewald Zeitung এ বেরোনো একটি ছোট্ট, নামবিহীন মৃত্যুসংবাদ:

“the wife of Dr H. in Dahlem, who is currently on the front, has set an end to her life by shooting herself. The reasons for this act of the unhappy woman are unknown.”

পারিবারিক অশান্তি, স্ত্রীর মৃত্যু এবং ফ্রান্স-ব্রিটেনে বিরূপ ভাবমূর্তি—তবুও ব্যক্তি হেবার তখনও টলেননি। বরং তাঁর প্রতিপত্তি বেড়েছে, বেড়েছে ধনসম্পদও। জার্মানি পরাজিত হলেও যুদ্ধের নায়ক হিসেবে স্বদেশে তিনি সম্মানিত। ১৯২০-তে হাতে পেলেন নোবেল পুরস্কার। কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর পদাধিকারবলে জার্মান বৈজ্ঞানিকমহলে অন্যতম বড়ো নামেদের একজন। সে পরিস্থিতিটাই বদলালো দ্বিতীয় দশকের শেষের দিকে। উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদ যুদ্ধের পরে বাড়ছিল, এমনিও ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ এবং তারপরের মহামন্দায় সে বৃদ্ধি হয় দ্রুততর। এবং অভিমুখ হয় পরিবর্তিত ও প্রসারিত। আদি রক্ষণশীল জার্মান জাতিচেতনায় খ্রিস্টান গোঁড়ামির সাথেই যুক্ত ছিল ইহুদিবিদ্বেষও। কাইজারের শাসনের শেষ দিকে ঐক্যবদ্ধ জার্মান জাতির স্রোতে ইহুদিবিদ্বেষ একটু চাপা পড়লেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয়ের পর খোলস ছেড়ে বেরোতে বেশি সময় লাগেনি। মনে রাখা ভালো, শুধু নাৎসিরা নয়, সিংহভাগ দক্ষিণপন্থী দলই সেসময় ছিল ইহুদি-বিরোধী।

একদিকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদীদের মদত দেবার অভিযোগ, আবার অপরদিকে তারাই নাকি সুদখোর পুঁজিপতি—সে এক অদ্ভুত যুক্তিজাল। জন্মসূত্রে ইহুদি হেবারও সেই বিদ্বেষের রাজনীতির হাত থেকে ছাড়া পেলেন না, তাঁকে দাগিয়ে দেওয়া হল ইহুদি ধনকুবের লিওপোল্ড কোপেলের ভাগ্নে হিসেবে। বলা বাহুল্য, দুজনের মধ্যে কোনো দূরসম্পর্কও অনুপস্থিত। হেবারের কাছে ধাক্কাটা ভীষণই অপ্রত্যাশিত। জীবনের শুরু থেকে নিজেকে জার্মান ভেবে আসা, যৌবনে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিজের ইহুদি সত্ত্বার প্রায় সবটুকু মুছে ফেলা, সর্বোপরি উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদের পরাকাষ্ঠা হয়ে ওঠার পরও ‘জাতির শত্রু’ দাগটা মেনে নেওয়া কষ্টেরই। কিন্তু আসল কথা হল, জেনে হোক বা না জেনে, এই বিপদকে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলেন হেবারের মতো অতি-জাতীয়তাবাদীরাই। নাৎসিবাদ তাঁদেরই উত্তরসূরি। জাতীয়তাবাদ চিরকালই একটা ‘শত্রু’ খোঁজে, জাতীয় ঐক্যের সূচনা করতে গেলে এরকম একটা শত্রুতা জরুরি। হেবারদের জাতীয়তাবাদে সেই শত্রু ছিল ফ্রান্স-ব্রিটেন, নাৎসি এবং নব্য-অতি দক্ষিণপন্থীদের চোখে সে জায়গাটা বরাদ্দ হল ইহুদিদের জন্য। বাঘের পিঠে চেপেছিলেন হেবার। ভুলে গিয়েছিলেন, নামার পথ নেই। তাই ১৯৩৩ এ হিটলারের ক্ষমতা দখলের পর হেবারের মতো বেশ কিছু গর্বিত জার্মানরাও হয়ে গেলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

ধর্মান্তরিত হওয়া সত্ত্বেও আর পাঁচজন ইহুদি বংশোদ্ভূতদের মতই কোণঠাসা হতে হল হেবারকেও। বারংবার চাপ আসতে থাকল ইহুদি সহকর্মীদের বরখাস্ত করতে। ঘুরিয়ে পদত্যাগ করার নির্দেশ হেবারের প্রতিও। পয়লা অক্টোবর, ১৯৩৩, কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি এন্ড ইলেক্ট্রোকেমিস্ট্রির ডিরেক্টর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ফ্রিৎস হেবার। পদত্যাগের পর পরিবার নিয়ে প্রিয় জার্মানিও ছাড়তে হল হেবারকে। সবাই পালাতে পারেননি, হেবারের নিজের ভাগ্নি মারা গেছিলেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে। বাকিরা সবকিছু ফেলে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে এসেছিলেন কোনোরকমে। প্রথমে সুইজারল্যান্ড, পরে স্পেন, প্যারিস হয়ে এককালের শত্রু দেশ ব্রিটেনে আশ্রয় নিতে হল তাকে। ব্রিটেনে থাকাকালীনই পরিচয় প্যালেস্টাইনবাসী ইহুদি biochemist চাইম ওয়াইজম্যানের সাথে। ওয়াইজম্যানই প্রস্তাব দিলেন, প্যালেস্টাইনের সিয়েফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব নিতে। এককালের অমিত প্রতাপশালী, রীতিমতো ধনবান হেবার তখন বিদেশে শরণার্থী, কপর্দকশূন্য বৃদ্ধ। রাজি হওয়া ছাড়া গতি নেই। বোন এলসার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন তিনি। অবসাদ, মানসিক চাপ এবং শারীরিক অসুস্থতা কাহিল করে তুলেছিল আগেই। ১৯৩৪-এর ২৯শে জানুয়ারি পথেই থামল রাসায়নিক যুদ্ধের পিতার যাত্রা—বাসেলের এক হোটেলে হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন ফ্রিৎস হেবার। মৃত্যুর পরেও যদিও জার্মান রাসায়নিক অস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট ছিল তাঁর। হিটলারের ‘ফাইনাল সলিউশন’-রূপে গ্যাস চেম্বারে ব্যবহৃত প্রধান গ্যাস Zyklon-B-র আবিষ্কর্তাও তো সেই ফ্রিৎস হেবারই।

যে কোনো সাহিত্যের ছাত্র হেবারের জীবনে হয়তো প্রাচীন গ্রিক হিরোদের ট্রাজেডি খুঁজে পাবেন। ভুল না একদম। যে লোকটা যুগান্তকারী আবিষ্কারে মানবতার মুখ হয়ে ওঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই নারকীয়তার জন্ম দেয়, যে পিতার এক সন্তান কৃষি বিপ্লব হলে অপরটি রাসায়নিক অস্ত্র, তিনি তো ট্র্যাজিক নায়ক হবেনই। আমি গ্রিক সাহিত্যের সাথে অত পরিচিত নই। আমার দৌড় বাংলা সিনেমার পরিচালকদের মতোই শরদিন্দুবাবুর ব্যোমকেশ অবধি। সেই ব্যোমকেশের ‘অগ্নিবাণ’ গল্পের একটা কথা ভারী উপযুক্ত মনে হয়:

‘মানুষ যেদিন প্রথম অন্যকে হত্যা করার অস্ত্র আবিষ্কার করেছিল, সেদিন সে নিজেরই মৃত্যুবাণ নির্মাণ করেছিল; আর আজ সারা পৃথিবী জুড়ে গোপনে গোপনে এই যে হিংসার কুটিল বিষ তৈরি হচ্ছে, এও মানুষ জাতটাকে একদিন নিঃশেষ করে ফেলবে—ব্রহ্মার ধ্যান-উদ্ভূত দৈত্যের মত সে স্রষ্টাকেও রেয়াৎ করবে না।’

এটুকু দেবকুমার সরকারের বিষাক্ত দেশলাইকে উপলক্ষ করে বলা। পাঠক হেবারের কথাও ভাবতেই পারেন একবার পড়ে। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা সেখানেই। কথাগুলো শুধু ফ্রিৎস হেবারের জন্য নয়। বিষটাও স্রেফ রাসায়নিক অস্ত্র নয়। আরও বড়ো বিষ আরও বেশি পরিমাণে তৈরি করে চলেছি, গিলে চলেছি আমরা প্রতিনিয়ত। এবং এ বিষের নির্মাণ হেবারের মতো ব্যক্তি বা মুষ্টিমেয় বৈজ্ঞানিকের হাতে হচ্ছে না। কিন্তু হচ্ছে সেই রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির মতোই ‘দেশের ভালো’, ‘জাতির ভালো’-র অজুহাতে। আর তাই, সেটা ধারণ করে নীলকণ্ঠ হওয়াটা সোজা নয় আর। একদমই নয়।

তথ্যসূত্র:

  1. The Poisonous Cloud: Chemical Warfare in the First World War by L.F. Haber
  2. The Chemist’s War 1914-1918 by Michael Freemantle.
  3. Science: a many-splendored thing by Igor Novak.
  4. Chemical Warfare and Medical Response During World War I by Gerard J. Fitzgerald.
  5. The first world war scientists who gave their lives to defeat poison gas by Simon Jones.
  6. The Origins of Chemical Warfare in the French Army by Jonathan Krause.
  7. Victor Grignard Biographical from www.nobelprize.org
  8. Clara Immerwahr from The Shalvi/Hyman Encyclopedia of Jewish Women by Jutta Dick.
  9. An Expedition to Heal the Wounds of War: The 1919 Eclipse and Eddington as Quaker Adventurer by Matthew Stanley
শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.