/ / বাসুকি নড়ে উঠুক (পুনর্পাঠ) – অমিতাভ গুপ্ত
|

বাসুকি নড়ে উঠুক (পুনর্পাঠ) – অমিতাভ গুপ্ত

শেয়ার করুন

শ্রেণিসমাজ থেকে এবং শ্রেণিসমাজের পক্ষাশ্রয়ী স্থিতাবস্থাপন্থীদের দুর্বুদ্ধি থেকে উৎসারিত যন্ত্রণাকে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রায়শ ক্ষেত্রকালনিরপেক্ষ বেদনার রূপকে ধৃত করেছেন। এই রূপকাভাসে প্রচ্ছন্ন রয়েছে প্রত্নকথা, লোককথা, রূপকথা। ১৯৭৮ মরিচঝাঁপিতে নির্বিবেক রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে (সম্ভবত তখন কোনো কবির একক প্রতিবাদ) তিনি যেমন ঠাকুমার ঝুলির অনুষঙ্গ প্রয়োগ করেছেন, তেমনই, একটু পা চালিয়ে ভাই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘প্রাগুক্ত’ কবিতাটির প্রায় একদশক আগে লেখা, “এই ভাই” কাব্যগ্রন্থের ‘উত্তর পক্ষ’ কবিতায় চরম কথাটি ব্যক্ত করেছেন বাসুকির অনুষঙ্গে :

বাঁধা রাস্তার পেটোর পর পেটো চমকাতে চমকাতে
আমরা হাঁক দিই
আমাদের আওয়াজে বাসুকি নড়ে উঠুক।

আপাতত তর্কাধীন নয় এ আলোচনা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাসুকি কতটুকু পুরানসম্মত, কতটাই বা লোকায়ত। এক্ষেত্রে যেহেতু ‘উত্তরপক্ষ’ কবিতাটি এসেছে ‘পূর্বপক্ষ’ কবিতার পরেই, বুঝতে অসুবিধে হয় না, এ বাসুকির সহস্র বিষাক্ত ফণা। সত্তর দশকে একদল ছেলেমেয়ে নিজেদের হাতে প্রতিরোধের ও প্রত্যাঘাতের অস্ত্র নির্মাণ করে বাসুকিকে নির্জিত করতে চেয়েছিল। পূর্বপুরুষের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বুঝেছিল পূর্বপুরুষেরা ‘গা বাঁচাবার নাম দিয়েছেন সহ্য’। পূর্বপক্ষ তখনও ভাবছেন –

বাবা জীবনেরা ঘরে শান্ত হয়ে বসো
সাপ আছে, শাঁখচুন্নি আছে
অন্ধকারে যেতে নেই

চোখের পাতা দুটো বন্ধ করে
ভালো করে দেখতে হবে
হা-ঘরে হা-ভাতেদের জন্যে কী করা যায়।

আর্ত বিদ্রুপে দীপ্ত “এই ভাই” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হল ১৯৭১ সনে যখন সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার জন্য ডাক-দেওয়া ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে উচ্চকোটির বাঙালিরা খুব বেশি শিল্প-সাহিত্য রচনা করতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে কিছুটা মুক্ত-উদার আচরণ করতে আরম্ভ করার পরে জানা গেল এবার নকশালবাড়িকে একটি চমৎকার পণ্য করে তোলা যায়। অতএব নকশালবাড়ি নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখা হতে শুরু করল প্রচুর পরিমাণে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো লেখা রোমান্সকে পুনর্লিখন করে নকশালপন্থী আবেগ দান করা হল, পত্র-পত্রিকা ও গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যাও, এই একটি বিষয় নিয়ে, স্ফীত এবং পৃথুল এবং বাণিজ্যিক সাফল্যে মান্যগণ্য ভাবেই প্রচুর হল। মুক্তির স্বপ্ন দেখা ছেলেমেয়েরা তখন অবশ্য আর তেমন বেঁচে নেই। হত্যা করা হয়েছে অধিকাংশ স্বপ্নকে। স্বপ্নদ্রষ্টাকে। বাকিরা জেলে, জীবন্মৃত তাঁরা মুক্তি পেলেন বিশ শতকের শেষ দশকে, সুদীর্ঘকালীন বন্দিমুক্তি আন্দোলনের পরে। হঠকারী, উগ্রস্বভাবী, অতিরোমান্টিক যে-কোনও হিসেবি বিচারেই হোক না, ঈষৎ শ্লেষে এবং প্রভূত আতঙ্কে তাদের অভিহিত করা হত ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সনে।
এই সময়সীমায় রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “এই ভাই” এবং “ছেলে গেছে বনে” কাব্যগ্রন্থ দুটি। অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে। যখন সমকালীন হৃদয়ে কুড়িয়ে নিয়েছিলেন বলেই, কবির এই কাব্যগ্রন্থ দুটি (তাঁর রচিত অন্যান্য বহু গ্রন্থের মতো) কালজয়ী হয়ে উঠেছে – তখন আরেকটি সত্যকে অথবা বাস্তবের আরেকটি মাত্রাকে উপেক্ষা করা যায় না। এ কথা সত্য যে কবি উত্তরণকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবের অন্যতর মাত্রা হল, ব্যাখ্যাতীত কারণে তিনি স্বপ্নদ্রষ্টার সঙ্গে মিশে যেতে পারছেন না এবং এই না পারার জন্য তিনি অধিকতর যন্ত্রণাবিদ্ধ :

আমি ভাবতে পারছি না
কেননা চারিদিকে
হিস হিস করছে সাপ
আমার সারা গায়ে
এখন দংশনের জ্বালা।।

– ভাবতে পারছি না’, এই ভাই



এবং, অঢেল ব্যর্থতায় বেদনায় কবি গ্রহণ করেছেন সেই অশান্ত মুহূর্তের নিষ্ঠুরতাকে :

মাথার ওপর খাড়া ঝুলিয়ে
শূন্যে
অহর্নিশ
শূন্যে
অহর্নিশ
পাক দিচ্ছে প্রলয়।

– এই ভাই’, এই ভাই

পুনরুচ্চারণের সৌকর্যে বিচলিত হয়ে কেউ কেউ হয়তো আবার সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবি প্রতিভার তুঙ্গতাটিকেই শুধু দেখাতে চাইবেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে তুঙ্গ প্রতিভাধর ছিলেন, তাঁর তুল্য কবি বিশ্বসাহিত্যে যে নিতান্তই কম – এসব কথা এখন আর মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সূর্য আমাদের আলো দেয় একথাটা যেমন বলার দরকার হয় না তেমনই প্রয়োজন নেই বলার যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবিতাকে এবং কাব্যভাষাকে অমিতদ্যুতি দান করেছেন। বর্তমান প্রয়াসে শুধুমাত্র এই বক্তব্যটিই নিবেদিত যে স্বপ্নদ্রষ্টাদের এই দুঃসময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাদের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন। কবিতার মাধ্যমে তিনি তাদের সঙ্গেই ছিলেন, কিন্তু এ তথ্য উপেক্ষিত ও অনাদৃত যেহেতু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তখন থেকেই কুশলী কুৎসা রটনা চলেছে। এই রটনার নেতৃত্বে ছিলেন অগ্রপশ্চাতে মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট বিশেষিত এবং পুঁজিবাদের মধুর সুহৃদ একটি দল। মরিচঝাঁপির ঘটনার পরে কুৎসাপ্রচার প্রবলতর হয়ে উঠল। থাক সে প্রসঙ্গ। সত্তর দশকের সূচনার দিকে আরেকবার লক্ষ্য ফেরানো যাক :

যেমন করে ছেঁড়া কাপড় জুড়ে জুড়ে
রঙিন সুতোয়
আমাকে বানিয়ে দাও ফুল তোলা কাঁথা

তেমনভাবে আমি চাই
তুমি আমার এই ছেঁড়াখোঁড়া
নিরুদ্দিষ্ট বল্গাহীন কথাগুলোর ডানা ধ’রে ধ’রে
যেখানে যার থাকার
সেখানে তাকে বসিয়ে দাও!

তোমাকে দরকার’, এই ভাই

আগ্রহী পাঠকের কাছে এই ভাই কাব্যগ্রন্থে ঘুরে ঘুরে সূর্যের কথা, রোদের কথা উত্তাপের (ওম-এর) কথা ফিরে ফিরে এসেছে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় যেন ভুলতেই পারছেন না ১৯৭০-৭১ সনের পশ্চিমবাংলার তথা নকশালবাড়ি-অনুপ্রাণিত ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশের রৌদ্রকরোজ্জ্বল প্রতিশ্রুতির কথা। আবার, এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক তাঁর আত্মজিজ্ঞাসা, হয়তো আত্মদহনও হয়ে ওঠে কিছুটা প্রাসঙ্গিক :

এখনও মিছিল গেলে স্তব্ধ হয়ে দাড়াই রাস্তায়
যে কোনো সভায় গিয়ে শুনি
কে কী বলে।
কেউ কিছু ভালো বললে দিই তাতে সায়।
সংসারে ডুবেছি তাই জ্বালাই না ধুনি।

‘ছেলে গেছে বনে’,
ছেলে গেছে বনে ।

দু’পৃষ্ঠার পরিসরে রচিত এই মহাকবিতার ধ্রুবপদ উচ্চারিত হয়েছিল আগেই, ফিরেও এল আবার :

ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে
মুক্তির লড়াই লড়বে বলে
ছেলে গেছে বনে।

দু’পৃষ্ঠার পরিসরে রচিত এই কবিতাটি মহাকবিতা হয়ে উঠেছে, যেহেতু একটি মাত্রায় ধৃত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্তনাদ (‘বাধা হয়ে আছে মোর বেড়াগুলি জীবনযাত্রার’), অন্যমাত্রায় স্পন্দিত শঙ্খ ঘোষের আর্তি (‘আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’)। অন্যান্য বহুতর মাত্রায় সংযুক্ত হয়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিজস্ব প্যারোলে লোককথা লোককবিতা লোকগানের ঐতিহ্য। ক্ষেত্রকালাতীত ঐতিহ্যের অন্বেষণ ও সংশ্লেষণ যে কবিতার মধ্যে অলভ্য নয় তাকেই মহাকবিতা বলা হয়। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার কথা গ্রন্থে শব্দবন্ধটিকে প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা রয়েছে বর্তমান নিবন্ধপ্রয়াসীর, ‘সরমা ও পরমা’ (‘আলোচনাচক্র’, ১৯৮৭) প্রবন্ধে। পরিহাসের বিষয় এই যে এখানে কেউ-কেউ নিছক দীর্ঘায়তনের কবিতাকেই মহাকবিতা বলে মনে করেন ।
জীবনানন্দ অবশ্য ‘শ্লেষে লিখিত’ শব্দদ্বয়কেও যুক্ত করেছিলেন মহাকবিতার বিশেষণপদে শ্লেষনৈপুণ্যের কোনো অভাব কখনো ঘটেনি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাচনিকটায়। বরং মান্য করা উচিত, তাঁর শ্লেষনিপুণতা একটি শ্লেষ–বৈদগ্ধ্যের স্তরে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু যখন সেই শ্লেষ আত্মবিদ্রূপের দিকে টলে পড়ে তখন যেন কয়েক বিন্দু চোখের জলকে আর লুকিয়ে রাখা যায় না।
প্রকৃত প্রস্তাবে, “এই ভাই” (১৯৭১) এবং ছেলে গেছে বনে (১৯৭২) দুটি কাব্যগ্রন্থকেই একবিসংহত পাঠকৃতির আকল্পে গ্রহণ করা সম্ভব। এই পাঠসংহতিটি উৎসারিত হয়েছে স্থিতাবস্থার প্রতি এমনকি নিজের প্রতিও শ্লেষ-বিদ্রুপ থেকে। অবশেষে মিলেছে রক্তাভ অশ্রুরেখায় যাকে তিনি ‘পাথরকুচির গান’ দিয়ে চিহ্নিত করলেন, প্রতিবেশী দেশের মুক্তিসংগ্রামকে ছুঁয়ে গেল সেই গান, ‘হে সাথী হে বীর/ সমাধিতে পর জয়ের মেলা।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যার্ঘের প্রসঙ্গ অন্যান্য গ্রন্থ ও গদ্য রচনা ছেড়ে দৃষ্টান্ত দিয়ে বিশদ করা যেতে পারে। আপাতত সে দায়িত্ব যোগ্যতর প্রাবন্ধিককে নিবেদন করে ফিরে আসা যাক সত্তর দশকের সূচনালগ্নের সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে।
কিংবা ফেরা যাক তার কিছুটা আগের সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সন, বা এই সময়সীমার কাছাকাছি কোনো পর্বে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবিতা রচনা থেকে একেবারেই বিরত ছিলেন। শ্রমিক সংগঠনে এবং শ্রমিক সংগঠনের কাজে বজবজ প্রবাসে ব্যস্ত হয়ে, কলকাতায় বিভিন্ন আন্দোলনকে ও স্বাধীনতা পত্রিকার পরিচালনায় যুক্ত হয়ে, দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ হয়ে, আর অবশ্যই নিজেকে কমিউনিস্ট পার্টির হোলটাইমার হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে তিনি কবিতা লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই দুর্ঘটনা কবির অনুরাগীদের উদ্বিগ্ন করে। “পদাতিক”-মুগ্ধ বুদ্ধদেব বসু ক্ষোভ ও আহ্বান জানালেন ‘কালের পুতুল’ প্রবন্ধে। হাজতবাসকালীন সহবন্দিদের অনুযোগেরও অন্ত রইল না। অবশেষে সুভাষ মুখোপাধ্যায় আবার ফিরে এলেন কবিতা রচনার কাছে, না-ফিরে উপায় ছিল না তাঁর।
ষাটের দশকে তিনটি কাব্যগ্রন্থ “দিন আসবে”, “যত দুরেই যাই” আর “কাল মধুমাস”। সত্তরের দশক শুরু হল “এই ভাই” কাব্যগ্রন্থ দিয়ে। পরের বছর প্রকাশিত হল “ছেলে গেছে বনে”। ১৯৭১-৭২ -এর কাব্যগ্রন্থ দুটি তর্কাতীত প্রমাণ রেখে গিয়েছে। নকশাল বাড়ি আন্দোলনের প্রতি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আবেগময় আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন।
আন্দোলনের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, একটি বিষয় মান্য করতে হয়। এই আন্দোলনের অভিঘাতে কবির সাময়িক জাড্য একবারে তিরোহিত হল। এরপর পাঠক পেয়েছেন নির্বাধ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং গদ্য শিল্পী সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। ততদিনে সংসদীয় গণতন্ত্র দীপিত করে প্রধানতম ‘বামপন্থী’ দল বিধানসভার অধ্যক্ষের ডানদিকে বসতে অভ্যস্ত হয়েছে, কমুনিজমকে কলঙ্কিত করার জন্য সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করতে দক্ষ হয়েছে, অপমানিত হয়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সহ আরও অনেকেই :
“এখন আমার পড়ন্ত বয়স, জীবনের বেশিরভাগই গেছে যুদ্ধে আজও ঘরে-ফেরাটা আমার কাছে খুব সুখের নয়। আমার আদুরে ছেলেটা সারাক্ষণ থাকে আমার পাশে পাশে তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে আমাকে সে ছেড়ে যায়।” (‘গাঁয়ে ফিরে’, ছেলে গেছে বনে )

অতিসংক্ষিপ্ত এই নিবন্ধ প্রয়াসের শেষে আরেকটি বিষয় নিবেদনযোগ্য মনে হয়। “এই ভাই” এবং “ছেলে গেছে বনে” কাব্যগ্রন্থ দুটি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিচেতনাকে অনুধাবন করার জন্য অত্যন্ত জরুরি, একক ব্যাক্তিত্বের জোরে তিনি সেদিন যেভাবে তথাকথিত হঠকারীদের সহমর্মী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন, ওই বিপজ্জনক সময়েই প্রকাশ করেছিলেন তাঁর কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ, সেই তেজস্বীতাটিও বরেণ্য – কিন্তু গ্রন্থদুটি পূর্ণতর পাঠগ্রহণ করতে গেলে ওই কালখণ্ডের বিচিত্র তির্যক দ্বান্দ্বিকতার পরিচয় নিতে হবে। স্বস্তি এই যে , সম্প্রতি নকশালবাড়ির আন্দোলন সম্পর্কে একাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ এবং বিশেষ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। ডক্টর ফাল্গুনী দে সম্পাদনা ও সংকলন করেছেন বিপ্লব এবং বাংলা কবিতা (বইমেলা, ২০১৮, দে পাব্লিকেশন) প্রবন্ধগ্রন্থের। এ বইটিতে রুশবিপ্লবের শতবর্ষ এবং নকশালবাড়ি আন্দোলনের অর্ধশতবর্ষ উভয় উপলক্ষেই প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। বিশ্বজিৎ ঘোষ, জলধি হালদার সম্পাদিত (বইমেলা, ২০১৭, বনগাঁ) এবং অন্য কথার প্রায় সহস্র পৃষ্ঠার নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছর সংকলনটি ফটোগ্রাফ ও ডকুমেন্টের প্রতিলিপি যুক্ত। এর আগে, ২০১৪ সালেই, একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল-প্রমাণাদি সংবলিত বই প্রকাশিত হয়েছিল, নাম “লাল তমসুখ” (সম্পাদক অমর ভট্টাচার্য, গাংচিল !)
এ বিষয়ে আরো অনেক গবেষণা গ্রন্থ এখন লভ্য। সারাৎসার যেটুকু জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার চা-বাগানে অনেকদিন ধরেই শ্রমিক আন্দোলন চলেছিল। ১৯৬৬ সালের অগাস্ট মাসে পুলিশের গুলিতে চা-শ্রমিক বীরপ্রধান নিহত হলে পঁচিশ হাজার চা-শ্রমিকের মিছিল সেই মৃতদেহ নিয়ে শহর পরিক্রমা করে। অবিভিক্ত সিপিএম তখন চা-বাগানের ধর্মঘটের নেতৃত্বে। ১৯৬৭ সালে তারা রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় এল। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গে শ্রমিক কৃষক আন্দোলন নকশালবাড়ি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সেই অঞ্চলেই একটি মহিলাসভায় গুলিবর্ষণ করে পুলিশ বা প্যারামিলিটারি সাতজন কৃষক রমণী, দুটি শিশু, একটি কিশোর ও একজন প্রৌঢ় কৃষক সহ এগারোজনকে হত্যা করে। তারিখটি ২৪মে, ১৯৬৭। পরের দিন হাসপাতালে মারা যান, আহত পুলিশ অফিসার মোলাম ওয়াংদি এবং পদপিষ্ট একদল কৃষক রমণী।
পরবর্তী পাঠ্য মিথ্যাচার ক্ষমতা হারানোর ত্রাস ইত্যাদি নিয়ে একটি কদর্য ইতিহাস রচিত হয়ে রইল। সে কদর্যতা বীভৎসতর হল ভ্রাতৃ হত্যায় ভগিনী নিধনে। অন্যদিকে তার আভায় অচেনা শ্রীকাকুলাম চম্পারণ ডেবরা গোপীবল্লভপুর বড়ো কাছের হয়ে উঠল।
কবি সুভাষ ইতিহাসের ওই কার্য ছায়াটিকে দেখে শিউরে উঠেছিলেন। মহত্তর ইতিহাসের আভার আভাসে হয়েছিলেন মহা কবিতার যাত্রী।

(পরিচয় ২০১৯ মার্চ–জুন সংখ্যায় প্রকাশিত)

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *