/ / বৈকাল হ্রদের পথে – সুদীপ মজুমদার

বৈকাল হ্রদের পথে – সুদীপ মজুমদার

শেয়ার করুন


অনুলিখন: গৌতম চক্রবর্তী 

মস্কো থেকে লম্বা লম্বা ফ্লাইট আসে ইরকুদ্স। ইরকুদ্স মস্কোর ফ্লাইট প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট। পাঁচ ঘণ্টা বা তার থেকে একটু বেশিই হয়তো লাগে ইরকুদ্স আসতে। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা মনে হয়। এখন বোধহয় এর চেয়ে অনেক কম সময় লাগে। আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা হল ২০০০ সাল। আমি তখন মস্কো বেসড। মস্কোতে চাকরি করি। মস্কোতে থেকে আমি সাইবেরিয়ার অনেক জায়গায় গেছি। বাইদাবাই ইরকুদ্স হল সাইবেরিয়ার একটা খুব নাম করা শহর। নোবাসব্রিস্ক হল সাইবেরিয়ার কমার্সিয়াল ক্যাপিটাল। ওখান থেকে সাইবেরিয়ার মেন্ বিজনেসটা কন্ট্রোল করা হয়। আমাদের যেকোনো জায়গার যেমন চারটে দিক থাকে, সাইবেরিয়ারও সেরকম চারটে দিক আছে। ইস্ট সাইবেরিয়ার বর্ডার হচ্ছে নোবাসব্রিস্ক; তারপরে আরও ওয়েস্টসাইডে যদি আসা যায় তাহলে সেই অঞ্চলটি হল উরাল, তারপর আরও সেদিকে এগোলে চলে আসা যায় মস্কোর কাছাকাছি। নোবাসব্রিস্ক থেকে যদি ডানদিকে যাওয়া যায় তাহলে যে অঞ্চলে পৌঁছনো যায় সেটা হল ইস্ট সাইবেরিয়া আর ইরকুদ্স হল গিয়ে সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ায়। বাকি যে দুটো দিক পড়ে রইল তা হল নর্দান ও সাউদার্ন সাইবেরিয়া। নর্দান সাইবেরিয়ার বিখ্যাত শহর হল নোরিলস্ক। নোরিলস্ক নিকেলের জন্য পরিচিত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো নিকেল ফ্যাক্টরি নোরিলস্কেতেই। এই নোরিলস্ক থেকে হাজার মাইল মতন গেলেই পাওয়া যাবে নর্থ সী। সেই সমুদ্র যেখানে এক সময় টাইটানিক ডুবেছিল। সেটা একেবারেই নর্থ সীর অন্য দিকে অবশ্য। যাইহোক এই সবকিছুর মাঝখানে সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ার শহর ইরকুদ্স যেখানে সেই অঞ্চলটিকে তুন্দ্রাও বলা হয়। এই সেই তুন্দ্রা যার কথা ছেলেবেলায় আমরা ভূগোলের বইতে পড়েছি যেখানে সারাবছর নাকি ঠান্ডা থাকে। সারা বছর ঠান্ডা থাকে এ কথাটা অবশ্য ঠিক নয়। তবে শীতকালটা লম্বা এবং সে সময় পড়া ঠান্ডাটা যে সাংঘাতিক সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরকুদসের পরে যে অঞ্চলটা জঙ্গল সেটাকে বলে টাইগা। টাইগা শব্দটার মধ্যেই যেন কেমন একটা গা ছমছমে ব্যাপার আছে! তুন্দ্রা যেমন শান্ত, স্নিগ্ধ শুনতে লাগে যার উচ্চারণের সঙ্গে আমাদের তন্দ্রা শব্দটার সাদৃশ্য আছে। টাইগার সেরকম কোনো বালাই নেই। টাইগা-র কিছু জঙ্গল এলাকায় সূর্যের আলো অব্দি ঢোকে না এতই ঘন সেখানকার জঙ্গল। আরও ইস্টের দিকে মানে জাপানের দিকে আমরা যদি যেতে থাকি তাহলে যে অঞ্চলটা পড়বে তাকে বলা হয় রিপাবলিক অফ সাখা। সেখানে কোনো জঙ্গল নেই তবে ছোটো ছোটো ঝোপে ভরা। এই সাখা অঞ্চলের রাজধানী হল ইয়াকুতিয়া। ইয়াকুতিয়া বেশ বড়ো শহর। ইরকুদ্স যাওয়ার আগে মানে ২০০০ সালের আগে আমি ইয়াকুতিয়া গিয়েছি। সাখাতে, সাখালিনে রাশিয়ান গভর্মেন্টের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিরাট প্রোজেক্ট আছে ও.এন.জি.সি. র। সাখালীন একটা বিরাট অয়েল ফিল্ড। সাইবেরিয়া কিন্তু কেবল তুন্দ্রা, টাইগা অথবা সাইবেরিয়ান ব্রাউন বিয়ারের জন্য বিখ্যাত নয়। সাইবেরিয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বস্তু হল ‘আলমাজ’। হীরের পাথরকে রুশ ভাষায় ‘আলমাজ’ বলা হয় যাকে আমরা সাধারণত কিম্বারলাইট বলে থাকি। এখানকার মানুষ টাইগা আর সাইবেরিয়ান বিয়ারকে তাদের ঈশ্বরের সম্পদ ‘আলমাজ’ -এর রক্ষক মনে করে। যাইহোক বার বার খেই হারিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে আসছি। সাখা অঞ্চলে দশ ফুটের বেশি বড়ো গাছ আমি দেখিনি। এই সাখা অঞ্চলের রাজধানী ইয়াকুতিয়ায় আমি যখন প্রথমবার গিয়েছিলাম, তখন যে গাড়ির সওয়ারি হয়ে এয়ারপোর্ট থেকে আমার গন্থব্যস্থলে চলেছিলাম সে গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তারা গাছ লাগায় না কেন? যতই হোক বাঙালি তো! জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ কী হাতছাড়া করা যায়! গাড়িরচালক আমার সঙ্গে একমত হল যে অন্য শহরে যেমন ইরকুদ্স-এ বড়ো বড়ো গাছ থাকলেও তাদের শহরে তা নেই। তবে এই গাছ না পোতার কারণ সম্পর্কে সে কিছু বলতে পারল না। হোটেলেও এই বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারল না। সন্ধেবেলায় ওষুধের এক ডিস্ট্রিবিউটারের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। ও বলতে ভুলে গেছি আমি তখন এক ভারতীয় ওষুধ কোম্পানির রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া ও ইউরোপ অঞ্চলের হেড আর সেই সূত্রে আমার এইসব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এই ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে আমার আগে ফোনের মাধ্যমে কথা হয়ে থাকলেও, সামনাসামনি সেই প্রথম দেখা। তার নাম আনাতোলি। সে আমাকে বলল যে সে আসলে এক এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার। সে আরও বলল যে সে আগে এভিয়েশনে কাজ করত। এখানে একটা এভিয়েশনের ওয়ার্কশপ ছিল। আমি সেখানে ইনচার্জ ছিলাম। কিন্তু দেশ ভেঙে গেল যখন, মানে ৯২ সালে, তখন এভিয়েশনের এই ওয়ার্কশপটাও বন্ধ হয়ে গেল। তার প্রয়োজনটা ফুরিয়ে গেল। এখন সব মস্কো, নোবাসব্রিস্ক, ভ্লাদিভস্তক ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গায় তৈরি হয়। সে বলল যে আমি তখন কিছু টাকা পয়সা নিয়ে এই ওষুধের ব্যবসা শুরু করি। আমার না কেমিস্ট্রি খুব ভালো লাগত আর প্লেনের মধ্যে যে কেমিক্যাল ব্যাপারটা আমি সেটাই দেখতাম, ইরোসন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আসলে কেমিস্ট্রির লোক, কিন্তু পড়াশুনো করেছি এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। খুব ইন্টারেস্টিং! আমি তখন এক বিদ্বান লোকের মতন তাকে বললাম, আচ্ছা ভাই বলো তোমরা এখানে বড়ো গাছ কেন লাগাও না? তখন আমার দিকে তাকিয়ে ও মুচকি মুচকি হাসল আর তারপর বলল খুব রাইট কোয়েশ্চেন। আসলে আমাদের এখানে বড়ো গাছ লাগালেও হবে না। কেন হবে না? লাগালে কেন হবে না? কি অসুবিধা? তখন সে বলল যে সুদীপ একটা জিনিস বোঝার চেষ্টা করো। মাত্র দু-তিন মিটার নীচেই জমা বরফ। আমি বললাম মানে? মাটির তলায় বরফ থাকে নাকি? মাটির তলায় তো পাথর। পাথর থাকতে পারে, তেল থাকতে পারে; হ্যাঁ তেল আছে হয়তো! না এই বরফ পার করেই কিন্তু তেল। মাটিটার ডেপথ বেশি নেই। বরফের ওপরে মাটির যে অংশটা দেখছ, সেই ওপরের অংশ কিন্তু পরে এসে জমেছে বন্যা ইত্যাদি হওয়ার ফলে । এটা হল কালেকশান অফ সয়েল। এটা আমাদের পুরোনো পৃথিবীর সয়েল নয়। এটা টপ সয়েল। আমি তখন বুঝতে পারছি না। এ আবার কি বলে রে! টপ সয়েল? টপ সয়েল আমরা জানি যে ধান ক্ষেতের ওপরে বা বৃষ্টি হয়ে ধুয়ে যায় যে অংশটা সেটাকে আমরা বলি টপ সয়েল এবং সরকার খুব চিন্তিত থাকে এই নিয়ে যে এর ফলে একটা উর্বর অংশ ধুয়ে যাচ্ছে যেটা চাষি নাকি এত কষ্ট করে কত বছর ধরে তৈরি করেছে! এটা একটা বিরাট লস। আবার টপ সয়েল যখন তৈরিও হয় বন্যার পর পলি পড়ে, তখন সেই সয়েল এ প্রচুর নিউট্রিয়েন্টও থাকে।  আমাদের গাঙ্গেটিক বেঙ্গলের সুন্দরবন অঞ্চলে আর কি! লক্ষীকান্তপুর ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সেসব ভাবছি।  লোকটা তখন বলছে, না আসলে হচ্ছে কি লাস্ট আইস এজ যেটা সেটার বয়স কিন্তু তিরিশ-পঁয়তিরিশ হাজার বছরের বেশি নয়। তারপর মাটি যেটুকু জমেছে তা বন্যা ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক কারণে এবং যেখানে বরফ গলেছে সেখানে জমেছে। আমাদের তলায় সেই জন্য লাস্ট আইস এজের বরফ এখনও আছে। আর কোথাও নেই। খুব অবাক হলাম। আমি কখনও এদিকটা ভেবেই দেখিনি। যে আইস এজের বরফ এখানে থাকতে পারে! বলল, হ্যাঁ আইস এজের বরফ এখানে আছে। সেই বরফের সঙ্গে মিশে আছে শিলা পাথর। সেই বরফ আর পাথর পেরিয়ে একটা দূরত্বের পর শেকড় আর যায় না।  একটা মিনিমাম টেম্পারেচার শেকড়ের দরকার। বরফে তাই গাছ হয় না। তাই আমাদের এখানে বড়ো গাছ হয় না। একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ভাবতেই পারিনি যে এটা একটা কারণ হতে পারে! কিন্তু এটাই কারণ। আমি পরে তথ্য দেওয়ার সময় আইস এজ গুলোর নাম দেবো। উরুম, কামলিয়াল ইত্যাদি এক-একটা আইস এজ গেছে আমাদের এক সময় পৃথিবীর ওপর দিয়ে। একমাত্র পৃথিবীতে আলাস্কাতে এবং এই অঞ্চলটায় মানে ইস্টার্ন তুন্দ্রা অঞ্চলে, মাটির তলায় বরফ জমে আছে। লোকটা বলল যে একচ্যুয়ালি আমাদের এই অঞ্চলটা একটা লেকের ওপরে। এই লেকের জল পুরো বরফ হয়ে যায় এবং বরফ হয়ে যাওয়ার পরে অন্য বহু জায়গায় বরফ গলে গেলেও এখানে এত ডেপথ যে এখানকার বরফ গলে যায়নি। তার আগেই মাটি চাপা পড়তে শুরু করে এবং বরফটা রিটেন্ড হয় তার মধ্যে। চিন্তা করুন ! আমরা এই ব্যাপারটা জানতাম না! কখনও বুঝতেই পারতাম না ওখানে না গেলে।

ইরকুদসের গল্প পরে বলব। আজকের গল্পের বিষয় হল বৈকাল লেক। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। মস্কো থেকে এসে পৌঁছলাম ইরকুদ্স। বৈকালের কাছে প্রধান শহর হল ইরকুদ্স। আমার যাওয়ার কথা ছিল ইরকুদ্স থেকে উলানুদে। উলানুদে হল একটি রিপাবলিক বুরেরতি। বৈকালের আকারটা অদ্ভুত। কেমন যেন বেঁকাটেরা  অনেকটা জোঁকের মতন। দেখে মনে হবে যেন একটা জোঁক পড়ে আছে। নীল রঙের একটা জোঁক পড়ে আছে। মহাকাশ থেকে দেখলে সেরকমই লাগার কথা। একদিকে বড়ো শহর হল ইরকুদ্স আর অন্যদিকে উলানুদে। নর্থ কোস্টে ইরকুদ্স আর সাউথে উলানুদে। সেখানে কোস্টটাকে বলা হয় বেরবুজিন। যাইহোক, আমি তো ইরকুদ্স-এ যথারীতি প্লেনে করে সকালে এসে পৌঁছেছি।রাতে প্লেনে ঘুমিয়ে কি করে পরের দিন তরতাজা হয়ে কাজ করতে হয় ততদিনে সে ব্যাপারে শিক্ষিত হয়ে উঠেছি। আসলে ওই ২০০০ সালের সময় প্লেনে জলের বোতল ক্যারি করতে দিত। সেই বোতলে পেপসি বা স্প্রাইটের সঙ্গে ভোদকা মিশিয়ে নেওয়া যেত। খাবার যখন দিত তখন তার সঙ্গে বোতল থেকে কয়েক চুমুক। ব্যাস! সেই যে চোখে ঘুম আসত, জাগতাম পরের দিন সকালে প্লেন ল্যান্ড করার একটু আগে। এটাকে বলা হত রাশিয়ান মেথড। আসলে আমরা অনেকেই জানি না যে ঘুমের ওষুধের অনেক ব্যাড এফেক্ট আছে। অ্যালকোহলের তা নেই। আরেকটা কথা, যে চায় না, তার হ্যাবিট ফর্ম করে না। আমার প্রায় পঁচিশ বছর ওই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক। আমার এতদিনেও অ্যালকোহল আসক্তি হয়নি। যাইহোক এতকিছুর পরেও আমার সে রাতে ভালো ঘুম হয়নি। তাই সকাল দশটায় আমার যে মিটিং ছিল, সেটাকে দুপুর দুটোয় পিছিয়ে নিলাম। সে যাত্রায় ইচ্ছে করেই শুক্রবার মিটিং রেখেছিলাম যাতে বৈকাল হ্রদ দেখবার জন্য শনি রবিটা হাতে পাই। হোটেলে পৌঁছেই স্নান করে, ব্রেকফাস্ট করে ঘুম দিলাম। রিসেপশনের মেয়েটিকে বলে দিয়েছিলাম আমাকে ডেকে দিতে। সে দেড়টা নাগাদ পার্সোনালি এসে একেবারে দরজা বাজিয়ে আমাকে ডেকে দিল। যাক রেডি হয়ে দেখলাম ডিস্ট্রিবিউটারের গাড়ি ইতিমধ্যেই এসে অপেক্ষা করছে। তাও প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে থেকে। তখন গরমকাল। ইরকুদ্স কে সে সময় যে কি সুন্দর দেখতে লাগে সে আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে এ কথা সে কথা বলতে বলতে আমার বৈকাল দেখবার ইচ্ছের ব্যাপারটা পাড়লাম। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল আরে কোনো ব্যাপার না! বৈকাল দেখানোটা আবার কোনো ব্যাপার নাকি! সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু এখান থেকে বৈকাল তো প্রায় ২৫০-৩০০ কিলোমিটার দূরে! ডিস্ট্রিবিউটর আমাকে আশ্বস্ত করল যে সে গাড়ি না পাঠালেও আমি যাতে নিরাপদ ভাবে ঘুরতে পারি তার ব্যবস্থা করে দেবে। সে যোগ করল যে বৈকাল থেকে ষাট-পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরে একটা শহর আছে যার নাম লিস্টবিয়াঙ্কা। সেখানে আমি থেকে, বৈকাল ঘুরে দেখতে পারি। বৈকালের কাছেও থাকবার ব্যবস্থা আছে, তবে দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার পর অনেক টুরিস্ট আসতে শুরু করার পর লিস্টবিয়াঙ্কাতে থাকার ব্যবস্থা বেড়েছে। খুব ভালো প্রস্তাব। সে বলল যে তোমাকে গাইড করার জন্য লিস্টবিয়াঙ্কার-ই একটি ছেলে থাকবে। তুমি আগে লিস্টবিয়াঙ্কা পৌঁছাও। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমাদের ওখানে একটা ডিপো আছে। ডিপোম্যান যিনি তার নাম দিমিত্রি। লিস্টবিয়াঙ্কায় তুমি আজ সন্ধেবেলায় বেরিয়ে যাও। হোটেল বুকিং হয়ে যাবে। আমরা করে দেবো। আমি তো অবাক! বলে কি! পথ তো প্রায় ২০০ কিলোমিটার এখান থেকে! সে বলল রাশিয়ায় দুশো কিলোমিটার কোনো ব্যাপার নয়। গাড়ি খুব জোরে চলে যেহেতু রাস্তায় সেরকম ভিড় থাকে না। রাশিয়ানদের জোরে গাড়ি চালানোর প্রবণতা আমি অবশ্য আগে খেয়াল করেছিলাম। তার কারণ হয়তো উন্নতমানের রাস্তা আর তারা নিজেরা এডভেঞ্চার প্রিয় বলে। তৃতীয় একটা কারণ আমার এখন মনে হয়। আমি যদি কাউকে বের হতে না দিই বছরের পর বছর তাহলে তার মনোগত ইচ্ছেটা তাকে হয়তো এইভাবে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। দেশটা আইরন কার্টেন্ড হয়েছিল বহুদিন। সবাই তাই বেরোতে পারত না। বেরোতে দেওয়া হত না সবাইকে। খুব কম লোকই সুযোগ পেত দেশের বাইরে যাওয়ার আর যে লোকটা সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ায় বসে আছে তুন্দ্রা, টাইগা পরিবৃত হয়ে, তার পক্ষে তো বেরনো আরও শক্ত। সেই কারণেই হয়তো গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে পেলেই এরা নিজেদের আর ধরে রাখতে পারে না। যাইহোক, আমাদের মিটিং-টিটিং শেষ হওয়ার পর সে আমাকে বলল যে আমি একটা ডিনারের ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু তোমাকে তো আজকেই রওনা দিতে হবে! ঠিক আছে কোনো সমস্যা নেই আমি ডিনারটা পিছিয়ে তাহলে সোমবার রাখছি। হাতে যেন চাঁদ পেলাম। সত্যি বলতে কি তখন আমার ডিনার করার কোনো ইচ্ছে ছিল না। লিসবিয়াঙ্কা আমায় টানছে তখন। বৈকাল আমাকে টানছে। ডিস্ট্রিবিউটার আমাকে বলল, চলো আমরা একটু বসি এখন। চা-কফি খাওয়া যাক। একটা কথা বলে রাখি এখানে, রাশিয়ানদের মধ্যে কিন্তু চা-কফি খাওয়ার প্রচলন ভীষণ ভাবে আছে এবং এনারা চা-কফি যখন খান তখন তার সাথে ভোদকাটাও খান। সুতরাং দাম, ডেলিভারি, পেমেন্ট এ সমস্ত নিরস ব্যাপার মিটিয়ে আমরা বসে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে যারা এসে বসল তাদের দেখে খানিক অবাক হলাম। যারা বসল তাদের কেউ কেউ গোডাউনে মাল তোলে বা গোডাউনের ম্যানেজার। শুধু তারাই নয় আমাদের সঙ্গে এসে বসল বাগান করেন যে মহিলা সে, আমাকে যেই ড্রাইভার নিয়ে এসেছে সেখানে সে। তারপর আমরা যেন কার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি জিজ্ঞেস করতে সেই বাগানের দেখভাল করা বয়স্ক মহিলা বললেন যে তারা তার মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছে যে একটু পরেই ইনস্টিটিউট থেকে এসে পড়বে। তার খুব ইচ্ছে  কোনো ভারতীয়র সঙ্গে আলাপ করার। আমাদের এখানে ভারতীয় খুব কমই আসে আর যারা আসে তারা রাতে থাকে না বা খুব বেশিক্ষণ থাকে না। মহিলা আরও জানালেন যে তার মেয়ে অমিতাভ বচ্চন আর রাজ কাপুরের খুব ভক্ত এবং ভারতীয় সংগীতেরও অনুরাগী।বলতে না বলতেই একটি অল্পবয়সি, সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী মেয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। এই সেই মেয়ে। জানা গেল তার নাম ইরিনা। সে সঙ্গে জনা দুই সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে এসেছে। তারাও ভারত এবং ভারতীয়দের সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী। হইহই করে আমাদের সময় কেটে গেল। সবাই খুব ভালো শ্রোতা। সত্যি কথা বলতে কি বাইরে না গেলে বোঝা যায় না আমাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে।আমরা যখন আমাদের নিজেদের সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি তখন তার মধ্যে কত হীনমন্যতা লুকিয়ে থাকে। অথচ যখন আমাদের এই আড্ডা চলছিল তখন এরা অষ্টাঙ্গযোগ, ইন্ডিয়ান মেডিটেশন, ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল মিউজিক এবং আরও কত কিছু বলে আমাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছিল যে তা আর বলার নয়। অথচ আমাদের নিজেদের এ ব্যাপারে কতটুকু আগ্রহ আছে! আমার বাবা পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার মুখে আমি কখনও ভারতীয় দর্শন অথবা ভারতীয় মার্গীয় সঙ্গীতের কথা অন্তত শুনিনি। মা-র কাছে শুনেছি, তবে সেটুকু তার নিজস্ব অল্পসল্প চর্চায় যেটুকু হয়েছিল সেটুকুই। গর্বে ভেতরে ভেতরে আমি ফুলে উঠছিলাম।
সন্ধে নেমে এসেছিল। ওরা সবাই উঠে পড়ল। আমাকে বলল হোটেলে গিয়ে গোছগাছ করে নিতে যাতে এখান থেকে লিস্টবিয়াঙ্কা যাওয়ার একটি দ্রুতগতির বাস আছে সেটা আমি ধরতে পারি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি লিস্টবিয়াঙ্কা শব্দটির অর্থ নিয়ে আমার মধ্যে একটা ধন্দ ছিল। ধরে নিয়েছিলাম লিস্ট শব্দটা যখন আছে তখন নিশ্চয় পাতাজনিত কিছু হবে। সেটা যে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে যাবে সেটা মালুম পেয়েছিলাম পরের দিন সকালে। সময়টা তখন সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি। দিন ছোটো হয়ে আসছে। তাহলেও সাইবেরিয়াতে তখন আটটার আগে সূর্য ডোবে না। আমি মোটামুটি সাতটা নাগাদ রওনা হয়েছিলাম। ভলভো বাসের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে তেমন রাশিয়ান মেক একটি বাসে চড়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নির পর লিস্টবিয়াঙ্কায় পৌঁছেছিলাম। তখন অন্ধকার। আগের উল্লেখিত ম্যানেজার আমাকে বাস স্ট্যান্ডে মিট করল। একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, বাসের মধ্যে একমাত্র ভারতীয় আমি ছিলাম। এমনিতে বাসে উঠলেই আমি ঢুলতে শুরু করি, কিন্তু এই সফরে আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারিনি। বাসে থাকাকালীন সারাক্ষণ কেউ না কেউ এসে আলাপ জমিয়েছে। নানান প্রশ্ন। ইন্ডিয়ার কোথায় থাকেন? কালকুত্তাতে (কলকাতাতে)? কালচারালি ভেরি রিচ। ল্যান্ড অফ টেগোর ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে অজ্ঞতাও যে তাদের মধ্যে একেবারে ছিল না তা নয়। কেউ কেউ বলে বসল—ও কালকুত্তা! ইটস ইন বাংলাদেশ। যাইহোক, পরে অন্য প্রসঙ্গে বিস্তারিত ভাবে বলব তবে এখানে হালকা ভাবে ছুঁয়ে রাখি। একটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম, ক্লাস টেন পাস ছেলেমেয়ে ওখানে এমন কেউ নেই যে বাড়ির ইলেকট্রিক ওয়ারিং করতে পারে না। এই জায়গায় আমাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিরাট ফারাক। আমরাও ক্লাস এইট নাইন থেকে লাইট, সাউন্ড, ম্যাগ্নেটিসিম ইত্যাদি পড়ে থাকি কিন্তু এর প্র্যাকটিক্যাল ইউটিলিটি প্রায় কিছুই জানি না। ওখানে কিন্তু তা নয়।  প্র্যাকটিকাল সাইডে ৫০% আর থিওরি সাইডে ৫০%। সুতরাং বলাইবাহুল্য দুটোই কিছুটা অন্তত না জানলে কেউ পাস করতে পারবে না। যাইহোক, সেই ম্যানেজার দিমিত্রি আমাকে তো মিট করল এবং খানিক দূরের এক গেস্টহাউসে নিয়ে গেল। সবচেয়ে ভালো ঘরটা আমার জন্য বুক করা ছিল। দিমিত্রি বলল যে এখান থেকে বৈকাল আরও প্রায় সত্তর কিলোমিটার পথ, তবে এখানে আমি টাইগা অঞ্চলের একটা গন্ধ পাবো। আমি বললাম টাইগা তো একটা বেশ গা ছমছমে অনুভূতি এনে দিতে পারে ভেবেছিলাম। গন্ধ আবার কী? সে হেসে বলল সেটা তুমি কাল সকালেই বুঝতে পারবে। আমার ছেলেবেলা থেকেই সকালে ওঠার অভ্যাস কিন্তু এখানে টাইম ডিফারেন্সের হ্যাপা থাকায় ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে শুলাম।  কিন্তু সকালে আর উঠবো কী! ভোর চারটেতে এখানে আলো ফুটে যায় আর তার সঙ্গে তাল রেখে পাখি টাখি ডাকতে শুরু করে দেয়। ঘুম তো ভেঙে গেল আর টাইগা-র গন্ধ রহস্য নিয়ে মনের ভেতর একটা উত্তেজনা তো ছিলই। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। সূর্য উঠেছে। আমার ঘরটা ছিল দক্ষিনমুখো। চোখের সামনে দেখতে পেলাম গভীর ঘন জঙ্গল। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার অত্যাচারে জানলাটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হল। জানলার বাইরে তাকিয়ে একটা গাড়ি দেখতে পেলাম যেটা ভীষণরকম শব্দ করতে করতে এগিয়ে চলেছিল। গাড়ির গায়ে লেখা ক্লেভ। রুশ ভাষায় ক্লেভের অর্থ হল পাউরুটি। একটু পরে আরেকটা গাড়ি চলে গেল। তার গায়ে লেখা মালাকো।  মালাকো শব্দের রুশ ভাষায় অর্থ হল দুধ। গাড়িগুলো জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল। আমাকে বলা হয়েছিল যে আমাকে শহরের এক প্রান্তে রাখা হয়েছে। বুঝলাম আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে গাড়িগুলো আসছে। আসলে একটা ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে রাশিয়ানদের বিরাট ফারাক আছে। ভারতবর্ষে আমরা সাধারণত বড়ো রাস্তার ধারে থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু রাশিয়ায় কর্মচারীরা মোটের ওপর এসব জায়গায় থাকে আর সচ্ছল বা সম্ভ্রান্ত মানুষজন এসব হাইওয়ে থেকে দূরে যতটা সম্ভব শব্দ কোলাহল থেকে দূরে থাকা পছন্দ করে। আমি ভাবলাম এভাবে বেশিক্ষণ বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ট্র্যাকস্যুট পরাই ছিল। গায়ে একটা সোয়েটার চড়িয়ে, স্পোর্টস সু পরে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরের দেখা সেই অপূর্ব নৈসর্গের বর্ণনা দেওয়ার  ক্ষমতা আমার অন্তত নেই। আর হ্যাঁ, নাকে এসে ঢুকছিল একটা অদ্ভুত গন্ধ। মুচকুন্দ ফুল, শিউলি ফুল আর সোঁদা মাটির গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলে যে গন্ধটা হতে পারে কতকটা সেরকম। আমি দিমিত্রিকে পরে প্রশ্ন করেছিলাম এটাকেই কি ও টাইগা-র গন্ধ বলছিল? দিমিত্রি কেবল মুচকি হেসেছিল। মুখে বলেছিল যে সে জানে না। হয়তো এটা কোনো গন্ধই নয়! যে জঙ্গলের ভেতর থেকে এই গন্ধটা বেরিয়ে আসছে সেখানে তো মুচকুন্দ ফুলের গাছের মতন কোনো ট্রপিক্যাল ক্লাইমেটের গাছের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। চারপাশে তো কেবল সারি সারি পাইন গাছ। সেই পাইনের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে অনেকক্ষণ ধরে হাঁটলাম। আমাকে আগে থেকে বলেই দেওয়া হয়েছিল যে এখানে ভয় পাওয়ার মতন কোনো পশু বা পাখি নেই। ভাল্লুক তো দূর অস্ত। দিমিত্রি বলেছিল যে তার জম্মো-কম্মো সব এখানে, কিন্তু সে কোনোদিন এখানে টাইগা-র বাদামি ভাল্লুক দ্যাখেনি। ওরা সাধারণত জনপদ এড়িয়ে চলে। খানিকটা এলোমেলো ভাবে চার-পাঁচ কিলোমিটার মতন পায়ে হাঁটলাম কিন্তু শহরটা ঠিক কোন্ দিকে ঠাহর করতে পারলাম না। বেলা বাড়ছিল। হঠাৎ মনে পড়ল বৈকাল যাওয়ার কথা।  অতএব হন্তদন্ত ভাবে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে ফিরে এলাম।  গেস্টহাউসে এসে দেখলাম দিমিত্রি এসে গেছে। গাড়ি নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে সঙ্গ দিচ্ছে তার বান্ধবী। আমি তখনও তৈরি হইনি দেখে সে তো অবাক! যাইহোক, তাকে আরেকটু অপেক্ষা করতে বলে আমি ঘরে এসে দাঁত মেজে নিলাম। সে আগেই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল স্নান না করার সুতরাং সেসব না করে ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম। সে এবার জিজ্ঞেস করল আমি জলখাবার খেয়েছি কিনা? আমি বললাম না। সেইসময় সেই গেস্টহাউসের মালকিন এক মোটাসোটা মহিলা বেরিয়ে এসে বলল তোমার খাবার তো তৈরিই আছে। তুমি ছিলে না বলে দেওয়া হয়নি। দিমিত্রি বলল যে এখান থেকে তো বৈকাল ঘণ্টাখানেকের পথ। তুমি বরঞ্চ জলখাবারটা খেয়েই নাও। পাইনকে রাশিয়ায় বলা হয় কিদ্রা। আমাকে জলখাবারে দেওয়া হয়েছিল কিদরোভস্কি আরেখ। আরেখের অর্থ রুশ ভাষায় হল বাদাম। এই কিদরোভস্কি আরেখ এমনই এক বস্তু যা মুখে দিলেই মুখ পুরো তেলে ভরে যায়। কেমন যেন একটু তেতো তেতো খেতে। এর থেকে আমাদের কাজু বাদাম ঢের ভালো। দেখেছিলাম এই কিদরোভস্কি আরেখ ওখানকার লোকে খুব ব্যবহার করে। এছাড়া জলখাবারে ছিল বেকন, চিজ ওমলেট, আলু ভাজা, কয়েক রকমের রাশিয়ান সালাদ আর মাছের একটা প্রিপারেশন। মাছের ভেতর হরেক রকমের মশলার পুর দিয়ে কিদরোভস্কি আরেখ তেলের মধ্যে ডুবিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রিপারেশন। এত বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা দিচ্ছি কারণ আমি নিজে রাঁধতে ভালোবাসি এবং এইসবই যা আমি ওদেশে দেখে এসেছি তা আমি এখন নিজেই রাঁধতে জানি। যাইহোক, খাওয়া তো ভালোই হল। জানতে পারলাম এরপর খাওয়াদাওয়ার পাঠ সেই দুপুরে। দিমিত্রির বান্ধবী লুদমিলার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে তার কাকার ওখানে একটা সেটআপ আছে। উনি আগে মাছের ব্যবসা করতেন কিন্তু এখন সে ব্যবসায় তেমন লাভ নেই। বাইরে থেকে আজকাল মাছ আসে তাই তিনি ডাইভার্সিফাই করার কথা ভাবছেন। উনি ঠিক করেছেন যে উনি কাঠের ব্যবসা করবেন। ওখানে ওনার থাকার ব্যবস্থা আছে। ওরা ওখানে গিয়েই উঠবে। আমার জন্য অবশ্য হোটেলের ব্যবস্থা আছে। এ কথা শুনেই আমি বেঁকে বসলাম। বেড়াতে বেরিয়ে কোনো পরিবারের সঙ্গে থাকার মজাটাই আলাদা। হোটেলে থাকার জন্য তো সারাটা জীবন পড়ে আছে। আমার আগ্রহ দেখে ওরা রাজি হয়ে গেল। তবে ঠাট্টা তামাশা কম করল না। দিমিত্রি তো একবার বলল থাকবার মধ্যে তো আছে গোয়াল ঘরটা আর গ্যারেজটা। তবে গোয়াল তো গরু ছাগলে ভরা আর গ্যারেজে আছে কিছু বলগা হরিণ। বলগা হরিণের কথা শুনে আমার চোখ তো কপালে। বলে কি! দিমিত্র নির্লিপ্ত মুখে বলল যে শীতে স্লেজ গাড়ি টানবার জন্য হরিণগুলোকে লাগে। এই গরমকালে কোনো কাজে আসে না। খালি খায়-দায় আর মোটা হয়। ওদের গুয়ে খুব দুর্গন্ধ। তুমি কি পারবে? লুদমিলা হাসতে হাসতে ওকে বকছে দেখে বুঝলাম ও ঠাট্টা করছে।গাড়িতে উঠে বসলাম। আগেই বলেছি গাড়িতে উঠলেই আমার ঘুম পায়। কিন্তু এই পথে চারপাশের দৃশ্য দেখে ঘুম মাথায় উঠল। ক্ষণে ক্ষণে জঙ্গল তার রং বদলাচ্ছে। পাতার রং বদলে যাচ্ছে। কোথাও পাতাগুলো মনে হচ্ছে যেন ঝলসানো আবার কোথাও কোথাও পাতাগুলো হয়ে উঠেছে রুপোলি। রুপোলি রঙের হেতু একটু পরে আমার কাছে পরিষ্কার হল। এই পাতাগুলো আসলে অনেক আগে শুকিয়ে গেছে আর তার ওপর একধরনের পোকা বাসা বেঁধে ডিম পেড়েছে। বাসাগুলো মাকড়সার জালের মতন আর তার তলায় পাতা আছে ডিম। তাই পাতাগুলোর ওপর একটা রুপোলি আভা যেন সারাক্ষণ চকচক করছে। আবার কোথাও পাতার রং বুড়িয়ে গিয়ে কমলা হয়ে গেছে। এগুলো আসলে শীত যে আসছে তার ইঙ্গিত।  এই ইঙ্গিত যে এবার পাতা ঝরার সময়। এছাড়া পৌঁছবার পথে মাঝে মাঝেই নীল জলের আভাস পাচ্ছিলাম। আমি সেটা বৈকাল লেক কিনা জিজ্ঞেস করতে ওরা বলল যে না ওটা আঙ্গারা নদী। পরে জেনেছিলাম যে সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী এই নদীটি ৩৩০টি ধারায় বিভক্ত হয়ে বৈকাল হ্রদে এসে পড়েছে। আঙ্গারাই একমাত্র নদী যা বৈকাল থেকে বেরিয়ে উত্তরের দিকে চলে গেছে।  একসময় নদীর নাম বদলে হয়ে গেছে ইনিসি আর নোরিলস্ক শহর পার করে শেষমেশ গিয়ে পড়েছে নর্থ সী-তে। অঙ্গারার রূপ অসামান্য বললেও কম বলা হয়।একসময় আমরা ছোটো শহরের মতন এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে বেশ কিছু ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল।  বুঝলাম এখানে ইংরেজি ভাষী মানুষজনের আনাগোনা আছে। এরপর আমরা আর দাঁড়াইনি। শেষে যেখানে এসে আমাদের গাড়ি থামল সেখান থেকে আমাদের চোখের সামনে কেবলই নীল, ঘন নীল জলরাশি। সেই জলরাশির মধ্যে দেখতে পেলাম দূরে বৌদ্ধ স্তূপের মতন স্তূপ। দিমিত্রি বলল যে ওটা কোনো বৌদ্ধ স্তূপ নয়। আসলে ওটা একটা দ্বীপ যার ওপরের বরফটা গলেনি তাই ওরকম দেখাচ্ছে। এরকম বেশকিছু দ্বীপ এদিকওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবচেয়ে বড়ো দ্বীপটার নাম ওলখান। এই দ্বীপ প্রায় ৭০ কিলোমিটার লম্বা। বৈকালের বুকে সবসময় ঢেউ খেলে চলেছে। এই ঢেউ খেলার ব্যাপারটা আমি আগেও অন্য হ্রদেও হতে দেখেছি। এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া হ্রদের কথা। আয়তনে ছোটো হলেও সেখানেও আমি একই ব্যাপার ঘটতে দেখেছি।  যাইহোক এই বৈকাল হ্রদ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মিষ্টি জলের হ্রদ।  পরিসংখ্যান বলে যে পৃথিবীর ২৩ থেকে ২৫ শতাংশ মিষ্টি জল এখানেই পাওয়া যায় আর এর গভীরতা হল ৫০০০ কিলোমিটার। ভেবে দেখলাম গুটিকয়েক মাউন্ট এভারেস্ট এখানে তলিয়ে গেলেও তার হদিস পাওয়া যাবে না। আর জল যে কী পরিষ্কার আর স্বচ্ছ তা বলে বোঝানো যাবে না! দিমিত্রিরা অভয় দিয়েছিল যে এই জল খেলে আমার কোনো সমস্যা হবে না। ওখানে সবাই ওই জল খায়। কাছেই কয়েকটা কিওস্ক ছিল যেখানে চা, কফি, সিগারেট আর অ্যালকোহল পাওয়া যাচ্ছিল। সেসময় অ্যালকোহলের জন্য কোনো আলাদা লাইসেন্স ওখানে লাগত না। এখন লাগে কিনা জানি না। আমার তখন তো এমন উত্তেজনা হচ্ছে ভেতরে ভেতরে যে পারলে আমি জুতো পড়েই জলে নেমে পড়ি। আমাকে বলা হল যে আগে একটু বসো, জিরিয়ে নাও কোনো গাছের তলায়। দেখলাম আশেপাশে বেদি করা আছে, বেঞ্চি পাতা আছে। ওদের কথা মতন একটু কফিও খেলাম।  উত্তেজনার বশে জিভ পুড়িয়ে ঢকঢক করে তখন কফি খেয়ে নিয়েছিলাম মনে আছে। তারপর জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে যেই জলে নেমেছি মনে হল কেউ যেন ছুরি দিয়ে আমার পা দুটো কেটে নিল। হাঁটুর তলা থেকে আমার পা দুটো নেই! আমি প্রায় আর্ত চিৎকার দিয়ে উঠে এসেছি। না কোনো জন্তু জানোয়ার ছিল না। শুধু ছিল কনকনে ঠান্ডা জল। পা দুটো যেন অসাড় হয়ে গেছে। ওরা তখন দূর থেকে আমার অবস্থা দেখে খুব হাসছে। তার কারণ ওরা জানত এটা হবে। যাই হোক কয়েকবার নামার পর ঠান্ডা তো সয়ে গেল। জলে নেমে একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপরে উঠে একটু জিরিয়ে নিলাম। তখন বাবা মা বেঁচে। তাই মাথায় টাথায় জল দিয়ে দাদুর নামে তর্পণ করলাম নমস্কার করলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। ওপরে উঠে আসার পর দেখি লুদমিলা আমাকে উদ্দেশ্য করে কি সব যেন বলছে। একটু মন দিয়ে শুনে বুঝলাম যে সে বলছে যে আমি নিজে তো উঠে এসেছি, কিন্তু সঙ্গে অতিথি হিসেবে কাকে নিয়ে এসেছি? তারপর এই ব্যাপারটা আমাকে আগে থেকে দিমিত্রি কেন বলে দেয়নি তাই বলে দিমিত্রিকে বকতে শুরু করল। দিমিত্রি দেখলাম উঠে গেল আর তারপর একটু নুন নিয়ে এসে নানা স্তোকবাক্য দিতে দিতে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটছে তা তো বুঝতে পারছি না। তারপর দেখি আমার ডানপায়ের গোছের পেছনদিকে একটা জোঁক মহানন্দে আমার রক্ত খেয়ে চলেছে। লুদমিলা জলে সেই নুন ভিজিয়ে জোঁকটার ওপর দিতেই সেটা খসে পরে গেল আর পা দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। তুলো দিয়ে কিছুক্ষণ চেপে রাখার পর রক্ত পড়া বন্ধ হল। আমি বললাম জোঁক আছে নাক? ওরা বলল, হ্যাঁ এই সময়টা খুব জোঁক হয়। শীতে খাবার পাবে না বলে এইসময়টায় ওরা খাবার সংগ্রহ করে। আমাকে বলল যে জলে নেমে এবার একটু সাবধানে থেকো। তুমি ভুল জায়গায় নেমেছিলে। একটু গাছপালা এড়িয়ে নেমো কারণ ওখানেই শ্যাওলার কাছেই তোমাকে ধরেছিল। যাইহোক এই ঘটনায় আমি আদৌ মুষড়ে পড়লাম না। বৈকালের সৌন্দর্যের কাছে কয়েক ফোঁটা রক্ত তো কিছুই না। এইভাবে সময় কাটতে লাগল। শেষ দুপুর যখন তখন দিমিত্রি বলল এসো কিছু খাওয়া যাক। খেয়াল করলাম লুদমিলা নেই। জিজ্ঞেস করতে দিমিত্রি বলল যে ও ওর কাকার বাড়ি গেছে। আমরা ওখানে গেলাম না এই জন্য যে একবার ওখানে গেলে আর ছাড়া পাওয়া যাবে না। ঠিক করলাম যে একেবারে রাতে আমরা ওখানে যাব। তাই কাছেপিঠে কোথাও খেয়ে নেব ঠিক করলাম। ঠান্ডার জন্য কিনা জানি না, সাইবেরিয়ায় খাবার দাবার কিন্তু খুব সিম্পল। বৈকাল ফেসিং একটা রেস্টুরেন্টে আমরা ঢুকলাম। আমরা পিলমিনি অর্ডার করলাম। পিলমিনিকে ডাম্পলিং বা মোমোর ছোটো সংস্করণ বলা যেতে পারে। খুবই সুস্বাদু এই খাবারটি সাওয়ার ক্রিম দিয়ে খেলাম। এছাড়া মেয়োনেজ ছিল, স্যুপ ছিল আর খিদেও পেয়েছিল। খাওয়ার পর ঠিক করলাম সন্ধে অবধি এখানে থেকে তারপর যাব। লক্ষ করলাম পাড়ের দিকে লোকে কি যেন কিনে কিনে খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে দিমিত্রি বলল মাছ খাচ্ছে। সেই মুহূর্তে মাছ খাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। দিমিত্রি সেইসব ফেরিওয়ালা যারা আমাদের কাছে মাছ বিক্রি করতে আসছিল তাদের না করে দিল।  পরে জেনেছিলাম ও সেই অতি স্বল্পসংখক রাশিয়ানদের মধ্যে পড়ে যারা মাছ খেতে ভালোবাসে না। দিমিত্রি হঠাৎ আমাকে বলল যে তুমি ওই সামনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসবে, আমি একটা কাজ সেরে আসছি। নয়তো তুমি চলো আমার সঙ্গে। আমি বললাম যে আমি সূর্য ডোবা অবধি এখানেই বসে থাকতে চাই। দিমিত্রি চলে গেল। বসে আছি। অন্ধকার হয়ে এসেছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম বাঁদিকে জলের মধ্যে ছপাৎ ছপাৎ আওয়াজ হচ্ছে। এর মধ্যে আমি অবশ্য দারবাওয়া কয়েকটা নৌকো যা স্থানীয়রা চালাচ্ছে দেখেছি। সেগুলো মাছের নৌকা না ভাড়া করে ঘুরে বেড়ানোর নৌকা সেটা আগেই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এইক্ষেত্রে আমার মনে হল আমি দেখতে পাচ্ছি কতগুলো কালোকালো বাচ্চা জলে খেলা করছে। কিন্তু এই ঠান্ডা জলে এমন সিমেট্রি রেখে তারা ঝাঁপাঝাঁপি করে চলেছে দেখে অদ্ভুত লাগছিল। ভাবছি এই সন্ধেবেলা কোন্ বাবা-মা তাদের ছেড়েছে এই জলে ঝাঁপাঝাঁপি করার জন্য? যদিও আইস বাথ এখানে একটা জলভাতের মতন ব্যাপার। এমনকি স্বয়ং ভ্লাদিমির পুতিনও মাঝেসাঝে আইস বাথ নিয়ে থাকেন। আমি তো ভেবে পাচ্ছি না। আমি যে বেঞ্চির ওপর বসেছিলাম তার পেছনের রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি যাচ্ছিল। তার আলোতে যা দেখলাম তাতে এটুকু বুঝলাম ঝাপাঝাপি যারা করছে তারা আর যাইহোক মানুষের বাচ্চা নয়। আকারে বেশ বড়ো তবে এগুলো যে আরও বড়ও হতে পারে সেটাও বুঝতে পারছিলাম। কৌতূহলবশত সামনের দিকে আরেকটু এগিয়ে গেলাম ভালোভাবে দেখব বলে। এদিকে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দিমিত্রি তখন গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেছে। ওকে এদিকটায় একটু আসতে বললাম। দিমিত্রি তড়িঘড়ি চিন্তিত মুখে এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল আমাকে আবার জোঁকে ধরেছে কিনা? আমি না বললাম আর ওকে জিজ্ঞেস করলাম কালো কালো ওগুলো কি লাফাচ্ছে। ও তো প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না।  তারপর আমার কথা শুনে বলল যে সুদীপ তুমি যা দেখেছ সেগুলো হল বৈকাল সিল। বোঝো! গোঁফআলা সিল মাছ! বৈকাল সিল এমন একটি প্রাণী যা একমাত্র বৈকাল হ্রদেই দেখতে পাওয়া যায়। আসলে তিরিশ হাজার বছর আগে আইস এজ যখন শেষ হয় তখন এই প্রাণীগুলো বৈকালে আটকা পড়ে যায়। কখনও কখনও অবশ্য এরা আঙ্গারা নদীতে চলে যায় ওদের খাবারের খোঁজে অর্থাৎ মাছের খোঁজে। কিন্তু আবার ফিরে আসে। এদেরকে বলা হয় পুসাশিবিরিকা। পুসাসি আদতে সিলমাছের সায়েন্টিফিক নাম। এই বৈকাল সিল আকারে ছোটো আর গড়ে এদের ওজন হয় সত্তর কিলো মতন। আয়ুকাল ষাট থেকে পঁয়ষট্টি বছর। এরা মানুষের মতন একটাই বাচ্চা বা কখনও কখনও যমজ বাচ্চা প্রসব করে আর এদের পেটে বাচ্চা ন-মাস মতন থাকে। এরা বাচ্চার জন্ম দেয় সাধারণত শীত যখন শেষ হয়ে আসছে সেই সময়। বাচ্চা সিল দেড় মাস মতন দুধ খেয়েই সাবালক হয়ে ওঠে। তারপর থেকে আজীবন একেবারে বড়োদের মতন সলিড ফুড খাওয়া চলে। পরে শুনেছিলাম যে যখনই এরা শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন থেকেই এদের মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হতে শুরু করে। মায়েরাও এদেরকে ছেড়ে দেয়। অব্যবহারের ফলে তাদের স্তনের বোঁটাগুলো দিনকয়েকের মধ্যে ছোটো হতে হতে প্রায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু তাদের বুকে দুধ থাকে। যেসব বাচ্চারা মায়ের দুধ কোনো কারণে পায় না তারা এদের কাছে চলে আসে। বাচ্চাগুলো যেন অভুক্ত না থাকে সেই ব্যাপারটা মাথায় নিয়ে প্রকৃতি এই ব্যবস্থা করে রেখেছে। পুরুষ সিলমাছের প্রাপ্তবয়স্ক হতে লাগে আট থেকে নয় বছর আর মেয়েদের ছয় থেকে সাত বছর। এটাও জানলাম যে ওই ভর সন্ধেবেলায় ওরা এমনি এমনি লাফালাফি করছিল না। আসলে ওই সময়টায় হ্রদের গভীর জল থেকে মাছেরা দলে দলে খাবারের খোঁজে ওপরে উঠে আসে আর তাদের শিকারের জন্য এতকিছু। আমি যখন দেখছিলাম তখন ওরা আসলে মাছ ধরে খাচ্ছিল। সূর্য ততক্ষণে ডুবে গেছে। বৈকালের তখন আরেক রূপ। বিস্তীর্ন জলাশয়ের ওপর তখন ঢেউ খেলে চলেছে। ক্লান্ত শরীরে আমরা তখন ফিরব। জোঁকের কথা তখন ভুলেই গেছি। লুদমিলার কাকার বাড়ি পৌঁছলাম। অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়ি। কাঠের বেড়া দেওয়া। ভিতরে একটা জায়গায় শুয়োরের খোয়াড় করা আছে। অন্যদিকে কয়েকটা গরু। এদের সবার স্থান চালার তলায়। ওরা বলল যে শীতকালে এই চালাগুলোকে ওরা চারপাশ থেকে বন্ধ করে দেয়। কেবল নিশ্বাস নেওয়ার জন্য একটু খোলা রাখা হয় আর ভেতরে আগুন জ্বলে। পরে জেনেছিলাম ভেতরে হিটার চালানো হয় যাতে জন্তুগুলো ওখানে থাকতে পারে। নয়তো অত শীতে মারা যাবে। বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে  সঙ্গে সবার কাছ থেকে সাদর অভ্যর্থনা পেলাম। যে ঘরটায় আমি ঢুকলাম সেটা একটা বসার ঘর আর বেশ লম্বা। কাঠের মেঝে আর তার সঙ্গে লাগোয়া একটা বারান্দা। যেহেতু তখন ঠান্ডা হাওয়া দিতে শুরু করেনি তাই ডবল লেয়ার্ড কাঁচের দরজাগুলো খোলা। জুতো পত্তর খুলে আমার জন্য রাখা তাপচকি অর্থাৎ ঘরের চটি পড়ে আরেকটা ঘরের ভেতর ঢুকলাম। সেখানে একটা লম্বা টেবিল পাতা আর তাতে থরে থরে সাজানো স্যালাড, মাছের প্রিপারেশন, মুরগির মাংস, কোল্ড ড্রিঙ্কস, ভোদকা ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই অঞ্চলের অনেকেই এসেছেন যারা এদের বন্ধু। আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন যেহেতু পরের দিন মানে রবিবার আমি ফিরে যাব। টেবিলের এমন একটা দিকে আমাকে বসতে দেওয়া হল যাতে সবাই আমাকে দেখতে পায়। প্রচুর খাওয়া দাওয়া হওয়ার পর আমার শরীর তো তখন একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। ঘুমে চোখ বুজে আসছে। কথাবার্তা হচ্ছে। সবাই শ্রোতা আর আমি একমাত্র বক্তা। তার কারণ সবাই ভারতের হাল হকিকত জানতে চায়। আমিও সাইবেরিয়া সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলে ওরা জবাব যে দিচ্ছিল না তা নয়। একটা জিনিস লক্ষ করলাম যে ওদের মধ্যে নিজেকে জাহির করার প্রবণতাটা খুবই কম। প্রায় নেই বললেই চলে। তারপর ধীরে ধীরে সবাই বিদায় নিতে শুরু করল। আমাকে তখন দিমিত্রিরা বলল যে এবার তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। তোমাকে স্নান করতে হবে। খেয়াল হল তাই তো! সারাদিন আমার স্নানই করা হয়নি। তবে আমার যে স্নান করার খুব ইচ্ছে যে ছিল তা নয়। বাথরুমে ঢুকে মাথা একটু ভিজিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে বেরিয়ে এলাম।  তারপর সঙ্গে রাখা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে লম্বা ঘুম। কিন্তু ভেতরে তখনও সেই তাড়না কাজ করে চলেছে যে বৈকাল দেখব। তাই আবার সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি সেই বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক যিনি সেই কাকিমার মা চা কফি বানানোর ব্যবস্থা করছেন। আমাকে দেখে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বৃদ্ধা তার পাশে বসালেন আর চা দিলেন। চা আমার মুখে রুচছে না আন্দাজ করতে পেরে তিনি  ললেন আমি কাকাও খেতে ইচ্ছুক কিনা ? দক্ষিণ আমেরিকাতে থাকাকালীন জেনেছিলাম কাকাও কোকো জাতীয় কোনো পানীয়কে বলে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। সুতরাং তিনি আমাকে দুধ দিয়ে এক গ্লাস কোকো বানিয়ে দিলেন। সেই স্বাদ আমার জিভে আজও লেগে আছে।  রোদ্দুর উঠে গেছে। মন কি আর বাধা মানে! বেরিয়ে পড়লাম। তখন কেবল ওই ঠাকুমা জেগে আর বাকি সবাই ঘুমিয়ে। বৈকালের ধারে তখন বেশ ঠান্ডা। বয়ে চলা হিমেল বাতাসের মধ্যেই কিছুক্ষণ ঘুরলাম। ঠিক করেছিলাম বৈকালে আজ স্নান করবোই। করেওছিলাম, কিন্তু স্নান যে কি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে মালুম পেয়েছিলাম। অথচ আমার চারপাশে রাশিয়ানরা অবলীলায় দল বেঁধে স্নান করে চলেছিল। ওদের বক্তব্য এই ঠান্ডা জলে স্নান করা শরীরের পক্ষে খুব স্বাস্থ্যকর। এতে নাকি শরীরের প্রতিষেধক ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু ভেতো বাঙালির শরীর কি অতসব বোঝে! বারদুয়েক দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ডুবকি দিয়ে উঠে পড়লাম। কিন্তু এই স্নান করার পর যে কি আরাম তা বলে বোঝাতে পারব না! জোঁকের খপ্পরে সে যাত্রায় আর পড়তে হয়নি। যাইহোক জলখাবারের ব্যাপারটা তো বলা হয়নি। বৈকালের পাড়ে তো ঘুরছি। এমন সময় আমাকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজতে খুঁজতে পাড়ে হাজির এক অচেনা লোক। আমি ওখানে তখন ইন্দু সুদীপ নামে পরিচিত হয়ে গেছি অর্থাৎ ইন্ডিয়ান সুদীপ নামে পরিচিতি লাভ করেছি। আগের দিন যেমন জলখাবারের জন্য দৌড়েছিলাম সেরকম দৌড়লাম।  দেখলাম সবাই অপেক্ষা করছে। একেবারে এলাহি ব্যাপার। ডিমের প্রিপারেশন, বেকন (এটা তো হবেই যেহেতু বাড়িতে শুয়োর আছে), বাড়িতে তৈরি করা অপূর্ব স্বাদের হ্যাম, দই থেকে তৈরি কান নামক পানীয় যেটা অনেকখানি গুজরাটিদের তৈরি ছাসের মতন। খাওয়া তো হল তারপর গেলাম স্নান করতে বৈকালে। তারপর ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে বেরোলাম মিউজিয়াম দেখতে। সেই মিউজিয়াম এর ডিরেক্টরের দেওয়া উপহার বৈকালের পাথর আজও আমার বাড়িতে আছে। স্নান করবার সময় রুশ ভাষায় বলেছিলাম মা বৈকাল সবার ভালো করো। তাতে আমার সঙ্গে স্নান করতে আসা দিমিত্রি আর জনা কুড়ি তার পরিবারের লোক ও বন্ধুরা হেসে আমায় বলল মা নয়, ওটা বাবা হবে। রবিবার আর সবার ছুটি বলে সবাই এসেছিল। ও বলা হয়নি আমার প্ল্যান চেঞ্জ হয়েছিল এর মধ্যে। আমি রবিবার রাতে নয় সোমবার সকালে ফিরে যাবো ঠিক করেছিলাম। ঠিক হলো সন্ধেবেলা সাসলিক করা হবে। সাসলিক একটি বিশেষ ধরনের কাবাব যা কাঠ কয়লা জ্বালিয়ে মাংস ঝলসিয়ে করা হয় আর সঙ্গে পরিমাণ মতন নুন ও মশলা দেওয়া হয়ে থাকে। রান্না করার আগের রাতে মাংস কেটে, ভালো করে ধুয়ে মুছে শুকনো করে আঙুর থেকে তৈরি করা মদে চুবিয়ে রাখা হয়। তারপর যথাসময়ে সামপুরে গাঁথা হয় মানে কাবাবের শিকে আর কি! শুয়োর ও চিকেনের মাংস নিয়েছিল, তবে বীফ দেয়নি আমাকে কারণ আমি বলেছিলাম বীফে আমার গন্ধ লাগে। এছাড়া ছিল ভোদকা যা ছাড়া রাশিয়ানদের কোনো অনুষ্ঠানই পূর্ণ হয় না। অনেকরাত অব্ধি খানাপিনা চলল। আমার যে গাইড ছিল ওখানে যে আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছিল তার ব্যাপারে বলতে হলে গাইডিংয়ের ব্যাপারে বলতে হয়।  ওখানে কিন্তু যে কেউ গাইড হতে পারে না। রীতিমতন পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে হতে হয়। আমার গাইড ওলগা বলে একটি মেয়ে হয়েছিল। খুব ভালো গাইড। একটা তথ্য এখানে দিয়ে রাখা দরকার। ১৯৯৬ সাল থেকে বৈকাল ‘ন্যাশনাল হেরিটেজ সাইট’ হয়েছিল। ও মাছের কথা তো বলা হয়নি। যখন সকালবেলা গেছি দেখি মাছ বিক্রি হচ্ছে। আমি মাছ দেখতে চাওয়াতে যে মাছ বের করল সেটার নাম অমূল। এই মাছ পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। মাছটাকে ওরা নিজেরাই প্রাগৈতিহাসিক মাছ বলে থাকে। ওটা আইস এজের আগে থেকে ছিল। বৈকালে সে আটকে গেছে। তার জম্মকম্ম সব ওখানেই।  মাছটার একটা কমার্সিয়াল ভ্যালু আছে আর মাছটার মধ্যে সেরকম কাঁটা নেই। মাছটাকে আগুনে সেঁকে নুন মাখিয়ে জলের ধারে ওরা বিক্রি করে।এ রপর বৈকাল আমি বেশ কয়েকবার গেছি। শীতকালে গেছি। এই অমূল মাছ আকারে প্রকারে বেলে মাছ আর গুরজালি মাছের মাঝামাঝি কিছু একটা বলা যেতে পারে। আরেকটা মাছ দেখেছিলাম যেটাকে বলা হয় স্টারজিনা রাশিয়ানে বলা হয় আসিটরিনা। এই মাছের ডিম ক্যাভিয়ার নামে বাজারে অনেক দামে বিক্রি হয়। রাশিয়াতে স্টার্জেনের ভালোরকম চাষ হয় এই ক্যাভিয়েরের জন্যে। লাল ক্যাভিয়ার পরিমাণে প্রচুর পাওয়া যায় কারণ এই মাছটা খুব শক্তপোক্ত। এই লাল বা কমলা ক্যাভিয়ার সংগ্রহ করার পর ভিনেগারে চুবিয়ে রাখা হয় আর অনেক সময় সরাসরি কাঁচাই খাওয়া হয়। কাঁচা খাওয়াটাই স্বাভাবিক। আঁশটে গন্ধর জন্য আমার ভালো লাগেনি কিন্তু যাদের গন্ধ সহ্য হয় তারা বলেছে অপূর্ব টক টক খেতে। কালো ক্যাভিয়ার আবার কুচকুচে আর হালকা কালোর মাঝামাঝি। এতে আঁশটে গন্ধ নেই আর অপূর্ব খেতে। তবে ভীষণ দাম। আমার মনে আছে তখনকার দিনে একটা পঞ্চাশ গ্রাম টিনের দাম ছিল ভারতীয় মুদ্রায় তিনশো টাকা। গ্রীলড স্টারজেনও বিক্রি হচ্ছিল তখন বৈকালের পাড়ে। ভারি জলখাবারের পর দুপুরে কোনো কিছু খাবার পাঠ ছিল না বলে আমি কিনে স্টারজেন খেয়েছিলাম। 

সন্ধেবেলা পার্টি চলাকালীন আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম। বলেছিলাম এই বৈকাল হ্রদ থেকে কটা নদী বেরিয়েছে? আমাকে অবাক করে দিয়ে উত্তর এল যে নদী নাকি একটাই বেরিয়েছে। তারপর যোগ করল যে এখানে তিনশোর ওপর নদী এসে পড়েছে। বৈকাল পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো হ্রদ। কেউ বলে এর বয়স পঁচিশ মিলিয়ন, কেউ বলে পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন বছর। টেটোনিক প্লেট সরে এই হ্রদ তৈরি হয়েছে। একটা প্লেট সরেছে ভারতের দিকে আর আরেকটা সরেছে নর্থ সী-র দিকে। তাতে একটা চিড় দেখা দেয়। হৃদ্যতা ওইখানেই সৃষ্টি হয়. যেহেতু জায়গাটা নীচু তাই বহু নদী এসে পড়ে এটাকে একটা অন্য রূপ দিতে পেরেছে। 

অর্থাৎ সাকুল্যে তিনশো তিরিশটি জলধারা বৈকালে এসে পড়েছে আর একটা নদী বেরিয়ে গেছে এখন থেকে যার নাম আঙ্গারা। এই যে হ্রদ থেকে নদী বেরিয়ে গেছে তার মুখে একটা বিরাট পাথর পড়ে আছে। পাথর না বলে সেটাকে একটা টিলা বললে ভালো হয়। এই পাথরটা যার দু’ধার দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে সেই পাথরটার নাম সামন-কামিন। সামন শব্দটি এসেছে সামনিসম থেকে যে বিদ্যা ওঝারা ভূতপ্রেত তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করে আর কামিন শব্দটার মানে হলো পাথর। এই বেরিয়ে যাওয়া জল পরবর্তী পর্যায় নদীর রূপ ধরে নর্থ সী-তে পড়েছে। জনশ্রুতি আছে যে এই বৈকালের যে আরাধ্য দেব, বৈকালের মালিক, তিনি একদিন জানতে পারেন যে তার কনিষ্ঠা কন্যা আঙ্গারা এক নিম্ন বর্গের পুরুষকে ভালোবাসেন। একটা লক্ষণীয় বিষয় হল রাশিয়াতে কিন্তু জাতপাতের কোনো ব্যাপার নেই। আগে ছিল কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই। গল্পটা এইরকম যে এই বিষয়ে জানতে পেরে বাবা বৈকাল যখন আঙ্গারাকে জিজ্ঞেস করেন যে এটা সত্যি কিনা তখন আঙ্গারা স্বীকার করে এবং যোগ করে যে সে এই ছেলেটির সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে চায়। এই শোনার পরে বৈকাল বাবা যখন বলল যে তাহলে তার সংসারে তার কন্যার কোনো জায়গা নেই, তখন আঙ্গারা জানাল তার দরকার নেই ওসবের।  আঙ্গারা যখন বেরিয়ে যায় তখন তার চলে যাওয়া পথে বৈকাল বাবা পাথর ছুঁড়ে মারে আর বলে সে যেন কোনোদিন ফিরে না আসে। সেই আঙ্গারা বেরিয়ে যায় আর পরে ইনিসি নাম নিয়ে নর্থ সী-তে পরে। এই হল বৈকালের উপাখ্যান। বৈকালের আর্টিস্টিক ডেপিকসান অনেকটা জটাখোলা শিবের মতন। এক বলশালী মধ্যবয়স্ক সুপুরুষ মনে হয় থাকে। যীশু খ্রিস্টের সঙ্গেও কিছুটা মিল পাওয়া যায় তবে চেহারাটা খুব বলশালী। এনথ্রোপোলজিস্ট অথবা সোশ্যাওলোজিস্টরা হয়তো কিছু পেলেও এতে পেতে পারেন। 

পরের দিন আমরা চা কফি খেয়ে বেরোলাম যখন আমাদের বিদায় জানাতে অনেকে এসেছিল। সেই স্মৃতি আমি কোনোদিনও ভুলব না। সেখান থেকে ফিরে একদিন কাটিয়েছিলাম লিসবিয়াঙ্কা-তে। তারপর সেখান থেকে ইরকুদ্স আর তারপর ফিরে গেছিলাম মস্কোতে।   

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *