একটি জরায়ু এবং কয়েকটি রাজনৈতিক ছেঁড়া জামা – অয়ন মুখোপাধ্যায়
জিরো পয়েন্টের লঙ্গরখানা
দেশভাগের রক্তক্ষরণ পিঠে নিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে তখন থিকথিক করছে ওপার বাংলার ‘উদ্বাস্তু’ মানুষের ভিড়। বাতাসে গোবর আর কার্বলিক অ্যাসিডের গন্ধ। ঠিক এই ভিড়ের মধ্যেই একটা কাঠের টেবিল পেতে বসেছিলেন অবিনাশবাবু—হিন্দু মহাসভার বড় নেতা। তিনি ফর্ম বিলি করতে করতে বলছিলেন, “আসুন ভাইসব! আসুন নেহরু আর জিন্নাহর পাপের ফলে আজ আপনাদের এই দশা। হিন্দু হওয়ার অপরাধে ভিটে মাটি ছাড়তে হয়েছে, সেটা ভুলবেন না!”
ভিড় থেকে উঠে এল দশ-বারো বছরের একটি কিশোর। নাম বিমল দাশগুপ্ত। ওপারে বাপ-ঠাকুরদার জমি ছিল, এপারে সে স্রেফ এক খণ্ড ছিন্নমূল শৈশব। কিশোর বিমল অবিনাশবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “বাবু, হিন্দু ব’লেই যে তাড়া খেলাম, সে তো বুঝলাম। কিন্তু এপারে এসে থাকার এক চিলতে জমি আর চালের জোগাড়টা কে করবে? হিন্দু মহাসভা চাল দেবে?”
অবিনাশবাবু আমতা আমতা করতেই স্টেশনের ওপাশে স্লোগান উঠল—’ইনকিলাব জিন্দাবাদ!’ একদল কমিউনিস্ট তরুণ কর্মীরা কোনো বড় বড় বক্তৃতা না দিয়ে স্টেশনেই লঙ্গরখানা খুলে খিচুড়ি দেওয়া শুরু করল। জবর দখল করা ফাঁকা জমিতে উদ্বাস্তুদের মাথার ওপর ছাদ বানাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল তারা। বিমল অবিনাশ বাবুর টেবিল ছেড়ে সেই কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো ছেলেদের দিকেই এগিয়ে গেল। ২০২৬-এর আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে নবতিপর বিমলের স্মৃতিতে সেই দিনটি আজও টাটকা।
গ্যালারির ওপার থেকে আসা চিৎকার
১৯৫১-র দশক। কলকাতা ময়দান তখন ফুটছে। মোহনবাগান যদি ওপার বাংলার মানুষের কাছে ‘এদেশি জমিদার দের’ প্রতীক হয়, তবে ইস্টবেঙ্গল হলো উদ্বাস্তুদের আত্মপরিচয়। ধর্মতলার এক কেবিনে বসে চা খাচ্ছিলেন দুই বন্ধু—সমরেশ আর অঞ্জন। অঞ্জন ঘোর ডানপন্থী, টেবিল চাপড়ে বলল, “তোরা যতই লাফাস, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে রোখা যাবে না। দক্ষিণ কলকাতা থেকে তিনি জিতবেনই জিতবেন!”
সমরেশ হেসে বলল, “তুই রাজনীতিটাকে ওপর থেকে দেখছিস অঞ্জন। তোদের শ্যামাপ্রসাদবাবু অবশ্যই বড় নেতা, কিন্তু ওঁর চারপাশে কারা? বড় বড় জমিদার আর বাবু কালচার এর উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের লোকজন। ওপার থেকে আসা মানুষগুলো জমি হারিয়ে এসেছে। তারা দেখছে এপারে এসেও জমিদারেরাই আসল ক্ষমতা ভোগ করছে, তখন তারা কার দিকে যাবে?”
“চারের দশকে কমিউনিস্ট পার্টিতে সোমনাথ লাহিড়ীদের যে তাত্ত্বিক ধারা ছিল, তা বদলে এখন এসেছে জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তদের মতো মাঠে ময়দানে সংগঠন করা লোক। ঠিক যেমন ময়দানে মহামেডানের দাপট কমে ইস্টবেঙ্গল রাজত্ব করছে, রাজনীতিতেও তেমনই ক্ষমতার নতুন সমীকরণ ঘটছে!”
৪৫ থেকে ৫ শতাংশের ম্যাজিক ট্রিক
১৯৫৩ সালের জুন মাস। কাশ্মীরে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হলো শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচন হলো সেই দক্ষিণ কলকাতা আসনেই। জনসংঘ ভেবেছিল সহানুভূতির ভোটে তারা অনায়াসে জিতে যাবে। কিন্তু ফল বেরোতে দেখা গেল অলৌকিক কাণ্ড—জনসংঘের ভোট ৪৫% থেকে নেমে এলো মাত্র ৫%-এ! আর জিতে গেলেন কমিউনিস্ট প্রার্থী।
অঞ্জন মাথায় হাত দিয়ে বসল, “কী করে এটা সম্ভব হলো বলতো সমরেশ? এক বছরের মধ্যে একটা দলের ভোট উবে গেল?”
সমরেশ বলল, “উত্তরটা লুকিয়ে আছে কলোনি গুলো তে। পুলিশ যখন উদ্বাস্তু দের উচ্ছেদ করতে আসছে, লাঠি হাতে দাঁড়াচ্ছে কমিউনিস্ট কর্মীরা। জনসংঘের নেতারা সেখানে গিয়ে শুধু দেশ ভাগের ট্র্যাজেডি আউড়ে আস ছিলেন। কাটা ঘায়ে নুন ছেটালে মানুষ যেমন কিছু ক্ষণের জন্য কাঁদে অঞ্জন, কিন্তু যে মলম লাগায়, মানুষ তার হাতটাই ধরে।”
ফল যা হওয়ার তাই হলো—১৯৫৭-র নির্বাচনে জনসংঘ ও হিন্দু মহাসভা পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুরোপুরি মুছে গেল। বিধান সভায় তারা পেল শূন্য আসন।
লাল দুর্গের পিছনের দরজা
সময় বয়ে গেল। তিন দশক ধরে বাংলায় একচ্ছত্র রাজত্ব করল লাল দুর্গ। আরএসএস অবশ্য ভেতরে ভেতরে তাদের শাখা বাড়িয়ে চলল নিঃশব্দে। এরপর এল ১৯৯৯ সাল। লোকসভা নির্বাচনের ফল। সারা বাংলা তোলপাড়। দমদমে নকশাল আন্দোলনের আঁতুড় ঘরে জিতেছে বিজেপি!
২০১১ সাল বামফ্রন্টকে হারিয়ে টিএমসির জয় সেই শুরু প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার। অবশেষে ২০২৬ এ ভোটের ফল প্রকাশের রাতে পঁচিশ বছরের তরুণ সুদূর দাশগুপ্ত বাড়ি ফিরল চড়া গেরুয়া আবির মেখে। সে সোজা গেল তার দাদুর ঘরে।
সুদূর এর দাদু স্বয়ং বিমল দাশগুপ্ত—১৯৪৮-এর সেই কিশোর আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ। জীবনের দীর্ঘ সময় যিনি সি.পি.আই.(এম)-এর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাটিয়েছেন।
সুদূর সগর্বে বলল, “দাদু, তোমাদের লাল দুর্গ শেষ। সারা পশ্চিমবাংলা এখন আমাদের জয় শ্রীরাম। যে ওপার বাংলা থেকে হিন্দুরা এখানে নিজেদেরকে ‘সর্বহারা’ বানিয়ে রেখেছিল, তারা আজ নিজেদের আসল পরিচয় চিনতে পেরেছে। আমরা আজ শ্যামাপ্রসাদবাবুর অপমানের প্রতিশোধ নিলাম।”
বিমলবাবু নাতির দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে রাগ নেই, শুধু এক অদ্ভুত করুণা। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আলমারির লকার থেকে একটা পুরনো ডায়েরি আর কাঠের কৌটোটা নিয়ে আয় তো দাদুভাই।”
ডায়েরির শেষ পাতায় ডেডবডি
সুদূর কৌটোটা খুলল, ভেতরে ওপার বাংলার সামান্য শুকনো মাটি। আর ডায়েরির শেষ পাতাটা ওল্টাতেই দেখল ১৯৫৩ সালের জুন মাসের একটা তারিখ। বিমলবাবুর নিজের হাতের লেখায় লেখা রয়েছে:
“আজ শ্যামাপ্রসাদ বাবুর শ্রাদ্ধের দিন। লুকিয়ে ওঁর বাড়িতে গিয়ে দেখি, হিন্দু মহাসভার বড় বড় নেতারা সব কোট-প্যান্ট পরে লুচি-মিষ্টির এলাহী আয়োজন করছেন। আর মণ্ডপের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ওপার বাংলা থেকে আসা এক বোবা-বধির উদ্বাস্তু পরিবার। ক্ষুধার্ত, জীর্ণ। মহাসভার কোনো নেতার চোখ সেদিকে নেই।”
“আমি থাকতে পারলাম না। পকেট থেকে একটা টাকা বের করে সেই বোবা লোকটার হাতে দিলাম। লোকটা আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তখনই আমার মোহভঙ্গ হলো। বুঝলাম, এই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে দেশভাগ একটা রাজনৈতিক তাস মাত্র, কিন্তু আমাদের মতো সর্বস্বান্ত মানুষের খিদেটা এদের কাছে অদৃশ্য। আমি সেদিনই হিন্দু মহাসভার স্বপ্ন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং পরদিন কমিউনিস্টদের লঙ্গরখানায় গিয়ে নাম লেখালাম…”
পড়া শেষ করে সুদূর স্তব্ধ! সে থতমত খেয়ে বলল, “তার মানে? তুমি… তুমি হিন্দু মহাসভার সমর্থক ছিল দাদু? তুমি কমিউনিস্ট ছিলে না প্রথম থেকে?”
বিমলবাবু বিছানায় উঠে বসলেন। শুকনো ঠোঁটে রহস্যময় হাসি—”শুধু আমি নই রে সুদূর। ১৯৫২ সালে যে কটা আসনে জনসংঘ আর হিন্দু মহাসভা জিতেছিল, তাদের জেতানোর পেছনে আমার মতো হাজার হাজার উদ্বাস্তু যুবকের হাত ছিল। আমরাই ছিলাম চারের দশকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আসল মেরুদণ্ড।”
“কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ বাবু মারা যাওয়ার পর, ওঁর দল আমাদের মতো ছিন্নমূল মানুষদের স্রেফ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। আমাদের খিদে, আমাদের বাসস্থানের লড়াইয়ে তারা আসেনি। এসেছিল কমিউনিস্টরা। তাই আমরা রাতারাতি দল বদল করে লাল ঝান্ডা ধরেছিলাম। আমরা কমিউনিস্ট হয়ে জন্মাইনি সুদূর, আমাদের কমিউনিস্ট হতে বাধ্য করেছিল তোদের ওই নেতাদের উদাসীনতা।”
নতুন বোতলে পুরনো মদ ও একবিংশ শতাব্দীর উচ্ছেদ
বিমলবাবু সুদূরের হাত থেকে মিষ্টির বাক্সটা নিলেন। একটা সন্দেশ মুখে দিয়ে বললেন, “আজ তোরা জিতিসনি সুদূর। আজ আসলে আমাদের সেই পুরনো অভিমানটা জিতেছে। যে উদ্বাস্তু ভোটারদের হিন্দুত্ববাদী দলগুলো এক সময় অবহেলা করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ পঞ্চাশ বছর পর সেই দলগুলো যখন আবার আমাদের পায়ে এসে পড়ল, তখন আমার নাতিরা ভাবল—এটাই বুঝি তাদের নতুন ঘর।”
সুদূর জানলার বাইরে তাকাল। বাইরে তখন বাজি ফাটছে। সুদূর বুঝতে পারল ২০২৬-এর এই আধুনিক ডিজিটাল বাংলার বুকেও তখন খেলা করছে এক প্রাচীন ছায়া। সে অনুভব করল, বাংলায় চিরন্তন ‘লাল দুর্গ’ বলে কিছু নেই, শাশ্বত ‘গেরুয়া মাটি’ও নেই। আছে শুধু একদল মানুষের বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা।
বাঙালি যখনই বিপন্ন বোধ করেছে, সে তখন কোন একটাকে একটা আশ্রয় হিসেবে খুঁজে নিয়েছে। ১৯৫২ সালে সে আশ্রয় খুঁজেছিল ধর্মের নামে; ১৯৫৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সে আশ্রয় খুঁজেছিল শ্রেণির নামে, রুটি-রুজির নামে; আর আজ সে আবার আশ্রয় খুঁজছে নিজের আদিম পরিচিতির নামে।
মতাদর্শগুলো আসলে এক-একটি পোশাক মাত্র। ভেতরে ছটফট করতে থাকা মানুষগুলো একই আছে—সেই ১৯৪৭ সালের শিয়ালদহ স্টেশনের উদভ্রান্ত, ক্ষুধার্ত, ভীতু উদ্বাস্তু। তারা শুধু যুগে যুগে তাদের ভগবানের নাম আর পতাকার রঙ বদলে নেয়!
জানলার কাচ ভেদ করে হঠাৎ একটা ভারী ইঞ্জিনের গর্জন আর আর্তনাদের আওয়াজ সুদূরের ভাবনায় ছেদ টানল। কলোনির মোড়ে ধুলো উড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের হলুদ রঙের দানবীয় বুল ডোজার। ‘অবৈধ দখল’ উচ্ছেদের চটকদার আইনি স্লোগানে এক লহমায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কয়েক দশকের উদ্বাস্তু কলোনির মাথার ছাদ।
ভাঙা ইঁট-পাথরের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে কোলে সদ্যো জাত শিশুকে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে একজন মহিলা, পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙা খাট আর যৎসামান্য বাসন-কোসন।
কালো ধোঁয়া ছেড়ে বুলডোজার টা যখন গর্জে উঠছে, সুদূর দেখল সেই হলদে দানবের গায়ে কোনো নির্দিষ্ট রঙ নেই—সেটা কখনো লাল, কখনো গেরুয়া, কখনো বা অন্য কোনো সাময়িক রাজনৈতিক রঙে ঢাকা।
শাসক বদলেছে, স্লোগান বদলেছে—কিন্তু ‘উন্নয়নের’ নাম করে সাধারণ মানুষকে ভিটে মাটি হীন করার নিষ্ঠুর কর্পোরেট উল্লাস কিন্তু একই থেকে গেছে।
বিমলবাবুও জানলা দিয়ে ধুলোর ঝড়টার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন, “দেখলি তো দাদুভাই? যুগ পালটায়, কিন্তু জরায়ু থেকে জন্ম নেওয়া সাধারণ মানুষের নিয়তি পালটায় না।”
“শিয়ালদহ স্টেশনের সেই গোবর আর কার্বলিক অ্যাসিডের গন্ধটা আজও যায়নি রে… ওটা আজ এই বুলডোজারের ডিজেলের ধোঁয়ার সাথে লড়াই করছে।”

