কেন এস আইআরকে ফ্যাসিবাদী প্রকল্প বলছি! – সুমন কল্যাণ মৌলিক
এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রকল্পের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পারাকলা প্রভাকর সঠিকভাবে মন্তব্য করেছেন: “SIR of electoral roll means that it is the government choosing the voters instead of the other way round”। এই ভাবনাটা ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভাবনার বিরোধী। সরকার যাদের ভোটার তালিকা দেখতে চায় না, তাদের ভোটার তালিকা থেকে এই প্রক্রিয়া বাদ দিতে চায়। ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিকের বক্তব্য এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন এসআইকরার সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের নয়। তাহলে প্রশ্ন হল এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের সিদ্ধান্ত আসলে কার! এই এসআইআরের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে কারণ কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন সরকারের এনআরসি করার পরিকল্পনা বিগত সময়ে গণ আন্দোলনের চাপে সফল হয় নি। এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে ( যাদের মধ্যে বেশিটাই সংখ্যালঘু,প্রান্তিক ও মহিলা) যদি রাজনৈতিক সমাজ থেকে বহিষ্কার করা যায় তাহলে এদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে রূপান্তরিত করা যাবে। তাই সহজ কথাটা হল এসআইআর ভোটার লিস্টের প্রয়োজনীয় সংশোধনী নয়,আদতে ভোটার লিস্টের পুনর্লিখন।
এসআইআর প্রকল্পের পরতে পরতে রয়েছে ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য। জার্মানিতে ইহুদি নিধন যজ্ঞ শুরু করার আগে ক্রমাগত মিথ্যা প্রচার করে ইহুদিদের বিরুদ্ধে এক ঘৃণার পাঠক্রম তৈরি করা হয়েছিল। এদেশেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একই ভাবে ঘৃণা ও সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে।অনুপ্রবেশের জুজু দেখিয়ে এসআইআরের পক্ষে বৈধতা তৈরি করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ জনগণকে শেখায় রাষ্ট্রের স্বার্থে জনগন বলিপ্রদত্ত।নোটবন্দী যেমন মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল,এই এসআইআর তেমনি এক তথাকথিত অনুপ্রবেশ মুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখিয়ে জনগণের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে। ফ্যাসিবাদের আরেকটি চরিত্র লক্ষণ হল মতপ্রকাশের অধিকারকে,প্রশ্ন করার অধিকারকে রুদ্ধ করা। এসআইআর শুরু করার আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সহ সমস্ত কমিশনারদের এমন ভাবে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা যাবতীয় প্রশ্ন ও আইন থেকে রক্ষা পান। এই রক্ষাকবচ থেকে সর্বোচ্চ আদালত বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছে যে কমিশনাররা কি আইনের সীমানার বাইরে! ফ্যাসিবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ সহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শাসকের সুরে কথা বলে। এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থাকলেও আদালত কিন্তু এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতা সংক্রান্ত মামলাটিতে কোন নির্ণায়ক রায় দেয় নি।সাম্প্রতিক সময়ে বিচারব্যবস্থা বিভিন্ন মামলায় যেভাবে সরকারের পক্ষ নিয়েছে তাতে অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতীয় জনগণের জন্য কি বিপর্যয় ডেকে আনছে তা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। কোনরকম সংবিধান সংশোধন ছাড়া,কোন দেশ ব্যাপী বিতর্ক ছাড়াই একতরফা ভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শাসক দলের অঙ্গুলি হেলনে ধ্বংস করে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সংসদীয় বিরোধী দলগুলো এসআইআরের প্রায়োগিক সমস্যাগুলোর বিরোধ করে এবং কিছু রিলিফ আদায় করে খুশি থাকছে। এরা ভুলে যাচ্ছে এই অবস্থানের কারণে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে তারা বৈধতা দিচ্ছে এবং গণ হারে ভোটদানের অধিকার বহিষ্কার করার কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে। দাবিটা হওয়া উচিত ছিল এসআইআর প্রক্রিয়াকে বর্জন করার, এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে বাদ পড়া সমস্ত নামকে ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তি। বলা উচিত ছিল ভোটার তালিকাকে সংশোধন করার কাজের সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ যুক্ত করা আইনবিরুদ্ধ, দাবি করতে হত আজ পর্যন্ত যত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোকে জনতার সামনে প্রকাশ করার এবং ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট বছরকে মান্যতা দেওয়া যাবে না। সৌভাগ্যের বিষয় হল মুষ্টিমেয় অধিকার সংগঠন তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ একথাগুলো বলেছেন। তবে সেই কথাগুলো যাতে জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে তার জন্য চেষ্টা জারি রাখতে হবে।

সুমন কল্যাণ মৌলিক
প্রাবন্ধিক

