নির্বাচনী ইতিহাসের বৃহত্তম জালিয়াতি – অর্ণব সাহা

শেয়ার করুন

১৮০ বাগনান বিধানসভা কেন্দ্রের এইআরও মৌসম সরকার ঊর্ধ্বতন ইলেক্টোরাল অফিসারের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে। তিনি চারদফা অভিযোগ আনেন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। বিএলও অ্যাপ, যেটি ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামক জোচ্চুরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার মাধ্যমে সামান্য নামের বানানের হেরফের, পিডিএফ কনভারশনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়মনীতিহীন ভুলত্রুটি, বয়স এবং লিঙ্গের গরমিল দেখিয়ে নাম বাদের প্রক্রিয়া, এমনকি একাধিক ভোটারের নামের ক্ষেত্রে উদ্ভট, অর্থহীন অক্ষরসমষ্টির মাধ্যমে বেআইনি পদ্ধতিতে নাম কাটার প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। মনে পড়বে, আসামের বিএলও সুমনা রহমান চৌধুরীর কথাও, যিনি ভূয়া ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে এলোপাথাড়ি বিপক্ষীয় ভোটারের নাম কাটার কাজে শরিক হতে না চেয়ে চিঠি লেখেন এবং চাকরি থেকে সাসপেন্ডেড হন। স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে ২০২৫-এর বিহার নির্বাচন প্রথম দেখাল নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে কীভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি একটা গোটা দেশের ভোটপ্রক্রিয়াকে কব্জা করেছে এবং সাধারণ নির্বাচন জিনিসটাকেই কার্যত প্রহসনে পরিণত করেছে। এর আগে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি নির্বাচনে নিছক সংখ্যার খেলায় তছরুপ করে ক্ষমতা দখল করলেও এসআইআর (Special Intensive Revision) নামক জোচ্চুরিকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে বিহার নির্বাচন থেকেই। যার আপ্রাণ প্রয়োগ ঘটেছে এবারের বাংলার আসন্ন নির্বাচনে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং বা ভোটলুটের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। স্বাধীনতার আগে শেষ যে কয়েকটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না। ১৯৩৭ অথবা ১৯৪৬-এ ভোট দিয়েছিলেন কেবল উচ্চ আয়সম্পন্ন, উচ্চ ট্যাক্সপেয়ার, উচ্চ ডিগ্রিসম্পন্ন এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূসম্পত্তির মালিকেরা। তাই জনসংখ্যার ১০% ভোটদানের অধিকারী ছিলেন তখন। সংবিধানে Universal Adult Franchise-এর প্রস্তাব কার্যকরী হবার সময় সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিল হিন্দু মহাসভা এবং জাতীয় কংগ্রেসের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা আরএসএস-এর লোকজন। তারা মূলত সামন্তবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী, নারী, শূদ্র ও মুসলমানদের অধিকারবর্জিত স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিল সেইদিন। নেহেরু, আবুল কালাম আজাদ, বাবাসাহেব আম্বেদকর ও পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধি, গোটা দেশব্যাপী ক্রমপ্রসরমান বামপন্থী আন্দোলন ও উগ্র দক্ষিণপন্থা বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর শক্তিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের এই সুপ্ত ইচ্ছা প্রতিহত হয়। এমনকি ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ অব্দি দুটো এনডিএ সরকারের আমলেও ভারতীয় অতিদক্ষিণপন্থী শক্তি সেই কাজে সফল হয়নি।

২০১৪-তে মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ত শক্তি তাদের এতোদিনের কল্পিত মনুবাদী, মুসলমান, দলিত ও নারীবিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজে প্রায় সফল। হাতে গোনা কিছু কর্পোরেট অলিগার্কির লগ্নি করা অন্তহীন টাকার থলি সেই কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে। ইডি, সিবিআই, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, প্রায় গোটা জুডিশিয়ারি, নির্বাচন কমিশনের মতো তথাকথিত নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ দখল করে ভারতীয় ফ্যাসিস্তরা অভ্যন্তরীণ ক্যু ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। আজ বিশ্বজোড়া অতিদক্ষিণপন্থা দেশে দেশে ভোট ব্যাপারটাই তুলে দিচ্ছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরব্যান, রাশিয়ার পুতিন, তুরস্কের এরদোগান আজ হয় ভোটপ্রক্রিয়া স্থগিত করে দিয়েছে নয়তো নিজেদের আমৃত্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনকালের মেয়াদ নির্ধারণের ব্যবস্থা করে ফেলেছে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ভয়াবহ সঙ্কট এর আগে এতো সুচারু কৌশলে আনা যায়নি!

এবার যাচ্ছে। মনোপলি ফিন্যান্স ক্যাপিটালের হাতে গোটা পৃথিবীই আজ এপস্টেইন আইল্যান্ড, যেখানে মৃত শিশুর মাংস তারিয়ে তারিয়ে খাবে বিশ্বের ধনকুবেররা। তাদের লুঠের মৃগয়াক্ষেত্র গড়ে তোলার কাজটা করে দিচ্ছে এই নয়া ফ্যাসিবাদী শাসকেরা!

অর্ণব সাহা

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *