বাঙালি নির্যাতনের ময়নাতদন্ত ( প্রথম পর্ব ) – সৌম্য মণ্ডল
পর্ব ১
আক্রান্ত কে – মুসলিম, শ্রমিক না বাঙালি?
নামে তার রামও ছিল নারায়ণও ছিল, তবু ছত্তিসগড়ের শ্রমিককে হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেললো কেরালায়। ছত্তিসগড়ের হিন্দু যদি বাংলাদেশী সন্দেহে গণধোলাইয়ের শিকার হয় কেরালার মত রাজ্যে, তবে গোবলয়ে বা হিন্দি অধ্যুষিত এলাকা গুলোয় বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গবাসী কতটা নিরাপদ?
অন্তত তিন জন পরিযায়ী শ্রমিক লাশ হয়ে ভিন রাজ্য থেকে ফিরেছেন, নতুন বছরের প্রথম মাসেই। এই জাতি বিদ্বেষী খুনের জম্বি সমর্থকেরা বলছে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের প্রতিক্রিয়াতেই নাকি শুধু মাত্র বাঙালি মুসলিমদের আক্রান্ত হতে হচ্ছে, হিন্দুরা নিরাপদ। সত্যি কি তাই? নাকি বাঙালির উপর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক জাতিগত নিপীড়নের এক সুদীর্ঘ অতীত এবং ভবিষ্যতের কোনও এক বাঁকে আমরা দাঁড়িয়ে আছি? এটা কি শুধুই বাংলাদেশি বিদ্বেষ নাকি বাংলাদেশ বাহানা বাঙালি নিশানা?
ব্যাপারটা হজম করা সত্যি কঠিন। এই যে আমরা যারা বাঙালি, যাদের ভাষায় এই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত লেখা হয়েছে, এই স্বাধীন দেশের অস্তিত্বের পেছনে যে ভাষার মানুষের সবচেয়ে বেশি রক্ত ঘাম, অনশনের পিত্ত, মুষ্টির জোর, পুলিশি নির্যাতন কক্ষের আর্তনাদ মিশে আছে, অতি দক্ষিণ থেকে অতিবাম- দেশের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক ধারার সৃষ্টি যে ভাষার মানুষেরা করেছেন, তাদের কি স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর নাৎসি জার্মানির ইহুদিদের মত অপর বানিয়ে দেওয়া সম্ভব? এ কি বিশ্বাস করা যায়?
বিশ্বাস করা সমস্যার বলেই হয়তো প্রাথমিক ভাবে রাজ্যের বাইরে পরিযায়ী শ্রমিক নির্যাতনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ হাজির করেছেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। কারো মতে বাঙালি নয়- এ সব শুধুই বাঙালি শ্রমিকদের উপর হয়রানি, কারো মতে বাঙালি শ্রমিক নয়, মুসলিমরাই আসলে আক্রান্ত, কারো মতে বাঙালি শ্রমিক বা মুসলিম নয় আসলে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রের সমস্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাই আসলে আক্রান্ত, বা গুরুতর কিছুই নয় যা হচ্ছে তা আসলেই ২০২৬ সালের নির্বাচনকে মাথায় রেখে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য হাওয়া তৈরি করার জন্য বিজেপি চক্রান্ত, অর্থাৎ বিজেপি নিজেই নিজেকে হারিয়ে তৃণমূল কে জেতাতে চায়, সেটিং তত্ত্বের মোক্ষম প্রমাণ আরকি!
এ তো দূরে বসে বুদ্ধিজীবীদের বিশ্লেষণ। কিন্তু যেহেতু বাস্তব ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ থেকে সত্যে পৌঁছানো বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাই ভুক্তভোগী বাঙালিরা ঠিক কী বলছে প্রথমে সেই দিকে নজর ফেরানো যাক।
এই ক্ষেত্রে প্রথমে বর্তমান লেখকের সাথে ভুক্তভোগীদের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকারের কিছু উদাহরণ এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর থেকে বাছাই করা কিছু মানুষের কাহিনীর উল্লেখ করা হবে।
২৯শে জুন ওড়িশা যাওয়ার কথা ছিল বীরভূমের ফেরিওয়ালা মহম্মদ আজহারউদ্দীন (৩১) এর। পরবের ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে ফেরার কথা ছিল,যেমনটা হয় প্রতিবছর। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হল কারণ তার এক মামা ইসা খান চৌধুরী এবং দুই মামাতো ভাই সোহেল চৌধুরী, জসিমুদ্দিন চৌধুরীকে গত ২৫শে জুন বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে ওড়িশার পুলিশ।
গত ২৫জুন মঙ্গলবার সকাল ১০টা নাগাদ বালেশ্বর জেলার রেমুনা থানা এলাকায় বাঙালি ফেরিওয়ালাদের আস্তানায় থানা থেকে এক কনস্টেবল এসে ফেরিওয়ালা দের বলে যে, থানায় নতুন অফিসার এসেছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড তাকে দেখাতে নিয়ে যেতে। ফেরিওয়ালারা থানায় গিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ফিরে আসার পর আবার সন্ধ্যায় থানা থেকে পুলিশ এসে তাদের জামা কাপড় গোছগাছ করতে বলে, এবং তাদের থানায় নিয়ে চলে যায়। পরের দিন ২৬ জুন ধৃতদের বালেশ্বরে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, এমনই দাবি পলাতক ফেরিওয়ালাদের।
ধৃতদের সাথে ডিটেনশন ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করেছেন বলে দাবি করেছেন শুক্রাবাদ গ্রামেরই রফিকুল(২৮) শেখ। তার দাবি আঞ্চলিক থানায় কথা বলতে গেলে জনৈক মহিলা ডিউটি অফিসার বলেন “তোরা সব বাংলাদেশি, নাহলে ওড়িশায় কেন এসেছিস? পশ্চিমবঙ্গে কি কাজ নেই?” রফিকুলের বক্তব্য “পশ্চিমবঙ্গেও তো অনেক ওড়িয়া লোক বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে, আমাদের তাহলে সেই কাজ গুলো দিয়ে দেওয়া হোক। তা ছাড়া একটা দেশ হলে, দেশের ভেতর পশ্চিমবঙ্গের লোকেদের যাওয়া আটকানো হবে কেন?”
ভবানীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান তাহামিদা খাতুন জানিয়েছেন বীরভূম জেলার নলহাটি থানার অন্তর্গত শুক্রাবাদ গ্রাম থেকে ১৭জন এবং পাইকোর থানার অন্তর্গত বোলচ্চানপুর গ্রাম থেকে ২ জনকে ওড়িশার ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। খাতুন জানিয়েছেন যে পঞ্চায়েত থেকে ধৃতদের নথিপত্র সরকারি দফতরে জমা দেওয়া হয়েছে।
২৫ তারিখ আটক ফেরিওয়ালা দেলসাদ চৌধুরী (৩৫) এর দাদা সামসাদ চৌধুরী জানালেন যে তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ওড়িশা যাচ্ছেন। কখনো এমন ঘটনার মুখোমুখি তিনি হননি। শুধু তাই নয়, তার বাবা এবং দাদুও ওড়িশায় ফেরি করেই সংসার চালাতেন। তাঁর আরও দাবি এই গ্রাম থেকে যারা বাইরে কাজ করতে যায় তাদের ৯৫% প্রায় হাজার খানেক মানুষ রাজমিস্ত্রি হয়ে নয়তো ফেরিওয়ালা হয়ে ওড়িশায় যায় বংশ পরম্পরায়। তিনি বলেন “এখন কেন এমন হচ্ছে বলতে পারবো না”।
ধৃতরা প্রত্যেকেই গ্রামের আদি বাসিন্দা এবং কেউ পরবর্তীতে বাংলাদেশ থেকে আসেননি বলে নিশ্চিত করেছেন পঞ্চায়েতের উপপ্রধান।
বর্ধমানের মন্তেশ্বরের কুলুট গ্রামের মোস্তাফা কামাল শেখ মুম্বাইয়ে ঝাল মুরি বিক্রি করেন। ৯ জুন রাত ৩টে নাগাদ মহারাষ্ট্রের পালঘরে তার আস্তানায় হানা দেয় স্থানীয় কানাকিয়া থানার পুলিশ এবং তাকে তুলে নিয়ে যায়। থানায় তার সাথে আরও ২২/২৩ জন বাঙালিকে এইভাবে আটক করা হয়েছিলো বলে তিনি জানিয়েছেন। দুই দিন লকআপে রাখার পর মহারাষ্ট্রের আরও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধৃত ১৫০ জনের সাথে মোস্তাফাকে বিমানে ত্রিপুরা নিয়ে যায় বিএসএফ এবং উলঙ্গ করে ব্যাপক মারধোর করে বন্দুকের নলের ডগায় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। মোস্তাফার দাবি, বাংলাদেশী সন্দেহে বেশ কিছু মহিলাকেও আটক করা হয়, তল্লাশির নামে পুরুষ বিএসএফ সেই মহিলাদেরকেও উলঙ্গ করে অত্যাচার করে। মাঝ রাতে বিএসএফ বাংলাদেশের দিকে তাদের ঠেলে দিয়ে বলেন “সামনে এগিয়ে যা, পেছনে ফিরলেই গুলি করবো”। এইভাবে বিএসএফ এর ভয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য হন।
জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে যে ওড়িশার ডিটেনশন ক্যাম্পে ৪৪৪ জন বাঙালি বন্দি আছে। গুরুগ্রামে বাঙালি ধরার গাড়ির খবরও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদ পত্রে। যারা ধরা পরছে তারা কি শুধুই মুসলিম?
৪ঠা জুলাই মহারাষ্ট্রের পুনে থেকে ১৬ জন মতুয়াকে বাংলাদেশী সন্দেহে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। বিজেপি ঘনিষ্ঠ নিখিল ভারত বাঙালি সমন্বয় সমিতির উকিল থানায় পৌঁছালে, তিনি দেখেন যে মুসলিমদের সাথেই এই মতুয়াদের একসাথে লকআপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। উকিল বাবু মুসলিমদের সাথে মতুয়াদের একসাথে রাখার প্রতিবাদ করলে পুলিশ জানায় যে হিন্দু মুসলিম তারা বোঝে না, তাদের কাজ বাংলাদেশী বিতাড়ন।
৯জুলাই ওড়িশার নব-রংপুর জেলার রায়গড়ে ১০জন মতুয়াকে পুলিশ আটক করলে নিখিল ভারত বাঙালি সমন্বয় সমিতির উকিলদের তৎপরতায় তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়৷ সংগঠনটির দাবি এরা প্রত্যেকে ৪০/৫০ বছর ধরে ভারতে আছে।
কোর্টে তুললে যেহেতু জামিনের সম্ভাবনা আছে, তাই পুলিশ বহুক্ষেত্রে ধৃতদের কোর্টে তুলছে না, ধরার পর সরাসরি বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে নিখিল ভারত বাঙালি সমন্বয় সমিতির কৌশল হল উকিল পাঠিয়ে চাপ দিয়ে বাংলাদেশী সন্দেহে ধৃতদের কোর্টে তোলা এবং জামিন করানো।
মুসলিম বিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারের জন্য সামাজিক মাধ্যমে কুখ্যাত দিবাকর দেবনাথ ১ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, এবং বিধানসভায় বিরোধী দলনেতাকে ট্যাগ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন- “বুদ্ধদেব বারিকের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয় বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু নয় খাঁটি ভারতীয় বাঙালি হিন্দু। এবং হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার ছেলে পেটের দায় গুজরাটে কাজ করতো। বাংলাদেশী সন্দেহে গুজরাট পুলিশ থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে মারধর করেছে। বিজেপি যদি মনে করে থাকে এইভাবে আমাদের হিন্দু ভাইদের মারধর করে ২০২৬-এ বাংলায় ক্ষমতায় আসবে তাহলে ভুল ভাবছে। দুষ্ট গরুর থেকে শূন্য গোয়াল ভালো। Narendra Modi Amit Shah BJP West Bengal Suvendu Adhikari যে পুলিশ কর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ চাই। ডকুমেন্ট যাচাই করুক একবার নয় ১০০ বার কোনও আপত্তি নেই। গা*ড়ে দম থাকলে পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৫ ধারা জারি করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডকুমেন্ট চেক করুক কে বাংলাদেশী তাদেরকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের ছুড়ে ফেলে দিক কোন সমস্যা নেই কিন্তু কোন নিরপরাধ হিন্দু ব্যক্তির গায়ে আঘাত হলে কিন্তু ছেড়ে কথা বলব না।”

উত্তর ২৪ পরগণার ঠিকাদার নাথুরাম বিশ্বাস ২৭ বছর ধরে গফরগাঁওএ কাবাডি বা ভাঙাচোরা জিনিসপত্রের কারবার করেন, তার গুদামে ২৫ জন বাঙালি লেবাররা কাজ করেন। তিনি আতঙ্কে ব্যবসা ছেড়ে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছেন। তার দাবি, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মধ্যরাতে পুলিশি অভিযানে শ্রমিকদের তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর তার কাছে আসছিলো। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেন শুধু মুসলিম নয়, হিন্দুদেরও ধরা হচ্ছে। নাথুরাম বলেন “আসলে তুলে নিয়ে গিয়ে পুলিশ এত মারছে যে, তাতেই সবাই ঘাবড়ে যাচ্ছে, তারা বলছে আমাকে যা মেরেছে তাতে আমি আর জীবনে কাজ করে খেতে পারবো না”।
নিখিল ভারত বাঙালি সমন্বয় সমিতির সভাপতি সুবোধ বিশ্বাস বর্তমান লেখককে বলনে- আসলে বাইরের রাজ্য গুলোতে বাঙালির প্রতি এক বিদ্বেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ৩সেপ্টেম্বর বর্তমান লেখককে দেওয়া পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস থেকে কথোপকথনের দিন পর্যন্ত সংগঠনটি ওড়িশা থেকে ৩২৫, গুজরাটে ১৮০, রাজস্থানে ২৩০, ছত্তিসগড়ে ৩৫, উত্তর প্রদেশে ৮০ জন, মহারাষ্ট্রে ৭২ জন মত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে উদ্ধারে সহায়তা করেছে।
ফারুকের বক্তব্য ২০১৪ সালের পর যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসে সেখানে টুকটাক বাঙালি শ্রমিকদের উপর নির্যাতন চলতো, কিন্তু এই বছর মার্চ মাস থেকে হঠাৎ বাড়াবাড়ি শুরু হয়, পেলেমগামের সন্ত্রাসী হানার পর এটা বেড়ে যায়, ফারুক বলেন “এই বছরের ট্রেন্ডটা একটু আলাদা, এতদিন যারা রাজমিস্ত্রির কাজ করতো, পাইপলাইনের কাজ করতো, তাদেরকে মারধোর করতো, পাবলিক মারধোর করতো পুলিশের প্রশ্রয় এবং সহযোগিতায়। এবার দেখলাম যে ফেরিওয়ালাদের উপর আক্রমণটা বেশি হচ্ছে। বাঙালি বিদ্বেষী যারা তারা তো করেইছে, পুলিশ কিডন্যাপারদের মতন কিডন্যাপ করেছে, রাতের অন্ধকারে, এটা সর্বত্র। এর মধ্যে উত্তর প্রদেশে ওদের কাছে পার হেড ২৫,০০০ টাকা করে দাবি করেছিলো। পরবর্তীতে দেখেছি প্রত্যেক রাজ্যেই এটা হয়েছে। মোবাইল কেড়ে নিয়েছে, ডকুমেন্ট ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে।”
কলম্বাসের বহু আগে মানুষ আমেরিকার মহাদেশে বসবাস করলেও ইউরোপীয়দের আবদার যে- কলম্বাসই আমেরিকা আবিষ্কার করেছে, বা ইউরোপীয়রা প্রথম কিছু দেখলে তবে সেটাই মানুষের প্রথম দেখা মানতে হবে, তেমনি মস্তিষ্কে বর্ণবাদের ফল্গুধারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে এই ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে যে নিম্নবর্ণের খেটে খাওয়া বাঙালির উপর আক্রমণটা আদতে বাঙালির উপর আক্রমণ নয়, সম্ভ্রান্ত বাঙালিরা আক্রান্ত হলে তবেই সেটা বাঙালির উপর আক্রমণ। যদিও নিম্নবর্ণীয় খেটে খাওয়া বাঙালিরাই বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ! কিন্তু বাঙালি হিন্দু মুসলিম শ্রমজীবী মানুষের উপর যে হয়রানি, তা কী মধ্যবিত্ত, উচ্চবর্ণ, সম্ভ্রান্তকে ছাড় দিচ্ছে? আরা আশ্বস্ত বোধ করছেন তাদের অবশ্যই হতাশ হতে হবে।
৩০ জুলাই টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানাচ্ছে যে পুনাতে বাংলাদেশী সন্দেহে প্রাক্তন ভারতীয় সেনা হাকিমুদ্দিন শেখ এর বাড়িতে ৩০-৪০ জন স্থানীয় পুলিশকে সাথে নিয়ে চড়াও হয় এবং নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। মধ্যরাতে হাকিমুদ্দিনের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের স্থানীয় থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রাত ৩টে পর্যন্ত হয়রানি করা হয়৷ প্রসঙ্গত হাকিমুদ্দিনের জন্ম উত্তর প্রদেশে৷ বাংলার সাথে তার কোনও সম্পর্ক নেই।
১৩ই অগাস্ট টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানাচ্ছে যে কলকাতায় এক প্রযুক্তিবিদ তার ১৪ বছরের খেলোয়াড় ছেলেকে নিয়ে নয়ডা গেছিলেন জাতীয় স্তরে স্কেটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। কলকাতা থেকেই অনলাইন অ্যাপ OYOতে হোটেল বুকিং করেছিলেন তারা। কিন্তু নয়ডা পৌঁছে দেখেন যে হোটেল বুকিং ক্যানসেল করে দেওয়া হয়েছে, এবং বুকিং এর টাকাও ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। বুকিং বাতিল করার কারণ হিসেবে জানানো হয় ১৫ই অগাস্টের আগে থানা থেকে জম্মু কাশ্মীর, পাঞ্জাব এবং বাংলাদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের ঘর দিতে বারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিবিদ যখন জানল যে তারা বাংলাদেশ নয় বরং পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন, তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ উত্তর দেন- “ঐ একই হল!”
প্রসঙ্গত জাতীয় স্তরের ঐ স্কেটিং প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছয় জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিলো। বর্তমান লেখক সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন ঐ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী আরও এক প্রতিযোগী দশ বছরের নীলাঞ্জনা রায়ের বাবা দীপক রায়ের সাথে, যিনি তার মেয়ে ছাড়াও আট বছরের আরও এক প্রতিযোগী তৃষাণজিত দাস এবং তার অভিভাবকের সাথে নয়ডা গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত দীপকরায় স্পোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI) অনুমোদিত কৃষ্ণনগরের স্পোর্টস ভিলেজের কর্ণধার এবং জেতার স্কেটিং সংস্থার একজন আধিকারিক। দীপক বাবুরা অনলাইনে জয় কৃষ গেস্ট হাউস নামে গ্রেটার নয়ডায় একটি হোটেল বুক করেন। ১৫০০ টাকা অগ্রীম দেন। কিন্তু হোটেলে হিয়ে দেখেন যে ম্যানেজার দীপক কুমার গেস্ট হাউসে নেই এবং দারোয়ান তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। দীপক কুমার কে ফোন করা হলে উনি জানান একটু পরে আসছেন, দীপক রায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেন, তবুও দীপক কুমার না আসলে পুনরায় ফোন করলে দীপক কুমারের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়৷ এর পর আগের দিন হেনস্থা হওয়া প্রযুক্তিবিদকে দীপক রায় ফোন করলে তাঁর কাছ থেকে তাদের হেনস্থা হওয়ার খবর জানতে পারেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়া প্রযুক্তিবিদের নাম বা ধর্মীয় পরিচয় না জানালেও দীপক রায় জানিয়েছেন তিনি একজন হিন্দু।
পরিযায়ী শ্রমিকদের মারধোর, ডিটেনশনে দেওয়া, বন্দুকের নলের ডগায় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একের পর এক খবরের মাঝেই ৩ অগাস্ট দিল্লি পুলিশ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গেস্ট হাউস বঙ্গভবনে একটি নোটিশ পাঠায়, সেখানে বলাহয় ধৃত কিছু ব্যক্তির পরিচয়পত্রে বাংলাদেশী ভাষায় লেখা আছে, যেগুলোকে হিন্দি এবং ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হবে( “The identification documents contain texts written in Bangladeshi and are needed to be translated to Hindi and English. Now, for the investigation to proceed further,) এর পর এই নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হওয়াতে বিজেপি নেতা কর্মীরা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা এবং বাংলাদেশের বাংলা কেন আলাদা সেটা বোঝাতে ইয়া বড় বড় লেখা লিখতে শুরু করলো, এমনকি বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য দাবি করলেন- বাংলার বহু ডায়লেক্ট তাই বাংলা বলে কোনও ভাষার অস্তিত্ব নেই।

যদিও এই ভাষা তাত্ত্বিক আলোচনা একেবারেই অনর্থক, কারণ দিল্লি পুলিশ বাংলাদেশের কোনও আঞ্চলিক ডায়লেক্টে লেখা গল্প কবিতা অনুবাদ করতে বলেনি, বলেছে পরিচয় পত্রের ভাষা অনুবাদ করতে। আর দুনিয়াতে কোথায় আঞ্চলিক ডায়লেক্টে সরকারি পরিচয়পত্র ছাপা হয় বলে বর্তমান লেখকের জানা নেই। বাংলার ক্ষেত্রেও প্রমিত বাংলাতেই সরকারি নথি হয়। নিচে বাংলাদেশের পরিচয়পত্রের একটি নমুনা দেওয়া হল। পাঠক দেখে জানাবেন কোন শব্দটা ভারতে প্রচলিত বাংলার থেকে আলাদা?

রাজ্যের বাইরেই কি বাঙালি হেনস্থার শিকার? সাত দিনের ভেতর শিয়ালদহে কারমাইকেল হস্টেলে ছাত্রদের উপর হিন্দিভাষীদের উপর বাংলাদেশী বলে মারধোর, হিন্দিভাষী বিজেপি সমর্থকদের প্রদেশ কংগ্রেসের দফতরে হামলার পর সহমর্মিতায় বাংলাপক্ষের নেতা গর্গ চ্যাটার্জি এবং কৌশিক মাইতি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের সাথে কথা বলতে হেলে সভাপতির সামনেই হিন্দিভাষী কংগ্রেসিদের বাংলাপক্ষের নেতাদের উপর হামলার ঘনটা দেখার আগেও আমরা বহুবার দেখেছি যে বাঙালিকে বাংলাদেশী বলা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে এটা বাংলাদেশ নয় ভারত, তাই হিন্দিই বলতে হবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা শারীরিক আক্রমণ শুরুর পর সামগ্রিকভাবে এই বিদ্বেষ বেড়েছে মাত্র। শুধু হিন্দিভাষীদের দ্বারা বাঙালিকে অপমান বা অত্যাচার নয় টালিগঞ্জ মেট্রোর বাইরে আতর বিক্রি করা মৈনাক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন- দুইজন বাঙালি তাকে আতর বিক্রি করতে দেখে বাংলাদেশী বলে হেয় করেছেন।
সুতরাং এটাকে শুধুমাত্র পরিযায়ী শ্রমিক বা মুসলিমদের উপর হেনস্থা হিসেবে দেখলে সমস্যাটাকে লঘু করা হয়। এবং সামগ্রিক ভাবে বাঙালিকে প্রতারণাপূর্ণভাবে আশ্বস্ত করা হয়। যা বাঙালি বিদ্বেষী স্টিমরোলারটিকেই পথ করে দেওয়া হয়।
কিন্তু এক্ষেত্রে জনতার মধ্যে বাঙালি বিদ্বেষ আর আইনি প্রশাসনিক হেনস্থা দুটোর মধ্যে পার্থক্য আমাদের করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনি প্রশাসনিক বাঙালি হেনস্থা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ, এবং বেসরকারি জনতার ক্ষেত্রে বিদ্বেষটা আইনি প্রশাসনিক নীতিরই প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখতে পারি। এবং এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে রাষ্ট্রীয় নীতির পেছনে শাসক শ্রেণী (শাসক দল নয়) বা অভিজাতদের স্বার্থ থাকে। তাই পরের পর্ব গুলোতে আমরা বাঙালি হেনস্থার আইনি দিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করবো।

