বাংলাদেশিরা উদ্বাস্তু না শরণার্থী – সৌম্য মণ্ডল

শেয়ার করুন

বাঙালি নির্যাতনের ময়নাতদন্ত – পর্ব ৪

SIR প্রক্রিয়ায় গণহারে বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু পরিবারেরা ডিলিট হয়েছেন। আগামী NRC প্রক্রিয়ায় আরও অনেক বেশি পরিমানে ডিলিট হবেন। আইন অনুযায়ী শুধু বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা নয়, পূর্ব-পকিস্তান থেকে এসে যারা আবেদন করে নাগরিকত্ব অর্জন করেননি তারাও ব্যাপকভাবে বাদ যাবে৷ এক্ষেত্রে বিজেপি সমর্থকরা দুটি পরস্পর বিরোধী বয়ান হাজির করেছে ১) মুসলিমরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুদের কোনো ভয় নেই (এই বক্তব্য যে প্রতারণা তা আজ প্রমাণিত)। ২) হিন্দু মুসলিম যেই অন্য দেশ থেকে আসলে তাকে তাড়ানো হবে, ভারত ধর্মশালা নয়।

বাংলাদেশ থেকে খুব সামান্য মুসলিম এসে ভারতে স্থায়ী ভাবে থাকেন, কিন্তু যারা স্থায়ী ভাবে এখানে বসবাস করেছেন তারা মূলত হিন্দু। ফলত হিন্দু উদ্বাস্তুরা বাতিল হচ্ছেন আইনের কারণে, অন্যদিকে মুসলিমরা বাতিল হচ্ছেন মুসলিম বিদ্বেষের কারণে। মুসলিম জনতা এই দেশের বৈধ নাগরিক। ফলত তারা নামের বানান ইত্যাদি ঠিক করে, কোর্টে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার বা নাগরিকত্ব হয়তো রক্ষা করতে পারেন আইনি ভাবে, যা উদ্বাস্তু হিন্দুদের পক্ষে অসম্ভব। প্রশ্ন হল বাংলাদেশীরা যদি ভারতে আসে, তবে তারা উদ্বাস্ত নাকি শরনার্থী নাকি অবৈধ অভিবাসী? বিনা ভিসা পাসপোর্টে বা বেআইনি ভাবে দুনিয়ার যেকোনো দেশে অন্য দেশ থেকে মানুষ প্রবেশ করলে তারা যৌক্তিক ভাবে অবৈধ অভিবাসী, এই কথাটা যেমন ঠিক, তেমনি এটা বাংলার ক্ষেত্রেও ঠিক কী? আইনি ভাবে হয়তো ঠিক কিন্তু নৈতিক বা রাজনৈতিক ভাবে এটাকে ঠিক বলা একটু সমস্যার।

১৯৪৭ সালে কংগ্রেস নেতা তথা ‘জাতির জনক’ মহাত্মা গান্ধী এক প্রার্থণা সভায় বলেন “যে সমস্ত শিখ ও হিন্দুরা পাকিস্তানে আছেন, তারা যদি সেখানে না থাকতে চান, তাহলে যেকোনো সময়ে, যেকোনো ভাবে ভারতে চলে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভারত সরকারের প্রথম কাজ হলো তাদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা এবং সুখ স্বাচ্ছন্দের ব্যবস্থা করা”।

১৫ জানুয়ারি ১৯৫০ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল বলেন ‘পূর্ব-বঙ্গের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মানুষেরা আমাদের রক্ত-মাংসের সমান, যাঁরা স্বাধীনতার জন্য আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন। তাঁরা একটা সীমারেখার ওপারে পড়েছেন বলে হঠাৎ বিদেশি বলে গণ্য হতে পারেন না। এই দেশের উপর তাদেরও অধিকার আছে।””

১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি  স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশ সংখ্যালঘুদের সম-মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা দেবে বলে স্বীকৃত হয়। এ ছাড়াও যদি কেউ সীমানা অতিক্রম করে ভারত বা পাকিস্তানে চলে আসতে চায়, তাহলে তাকে সরকারি সহায়তা দান করার কথা বা কতো টাকা তারা সাথে আনতে পারবে সহ বিভিন্ন বিষয় লেখা আছে ওই চুক্তিতে।

দেশান্তরিত মানুষের ঢল সামলাতে না পেরে নেহেরু মন্ত্রীসভার দুই মন্ত্রী সি বিশ্বাস এবং এ কে চন্দকে পূর্ববঙ্গে পাঠানো হয়। তারা বলেন যে, সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারত সরকারের ক্ষমতা সীমিত, তাই নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির উপর ভরসা রেখে যেন ভারতে আসতে আগ্রহীরা নিজের ভিটেতে রয়ে যান, তবে যদি কখনো পাকিস্তানে থাকা সম্ভব নয় মনে করেন, তখন ভারতে চলে আসলে ভারত সরকার তাদের নাগরিকত্ব ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।

কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রথম দুই বাংলার সীমান্তে কাঁটা তার দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার। তখন দল নির্বিশেষে বাংলার নেতাদের প্রতিবাদে সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার পরিকল্পনা প্রত্যাহার করা হয়। যদিও ধিরে ধিরে কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে সীমানা। আমাদের কাছে এখন সীমান্তে কাঁটা তারটাই স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু পাকিস্তান সীমান্তেও ‘৪৭ সালের পরে ৩ বছর কাঁটাতার ছিল না। এখনো নেপাল-ভুটান-চীন সীমান্তে কাঁটাতার নেই। গোটা দুনিয়ায় হাতে গোনা কয়েকটি সীমান্তে কাঁটাতার আছে। কাঁটাতার দিয়ে মানুষের যাতায়াত রোখা অত্যন্ত অমানবিক কাজ।

যদিও ভারত সরকার পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষদের কখনোই নিঃশর্ত নাগরিকত্ব প্রদান করেনি। তবুও নাগরিকত্ব লাভের বেশ কিছু শর্ত রেখেছিলো। কিন্তু দেশান্তরিত মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়াই হবে না এরকম কোনো নীতি নেয়নি, যা ২০০৩ সালে করে দেখালো অটল বিহারি বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রীত্বে বিজেপি সরকার। ২০০৩ সালের ‘নাগরিক সংশোধনী আইনে’ দেশান্তরী মানুষদের সরকারি ভাবে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হলো, এবং তারা বা তাদের সন্তানরা যাতে কখনোই নাগরিকত্ব না পায় তার ব্যবস্থা করা হল। ফলে মতুয়া সহ বিভিন্ন দেশান্তরি মানুষদের উপর হয়রানি জুলুম বাড়তে থাকে।

ভারত বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান যেহেতু একই দেশ ছিল এবং দেশভাগের সময় জনগণের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি, শুধু তাই নয়, দেশভাগের সময় যেহেতু দেশের রাজনৈতিক নেতারা সদ্যোজাত ভারত রাষ্ট্রের উপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে পাকিস্তান থেকে এক সাথে ভারতে না আসার আবেদন জানিয়েছিলেন এবং পরে যখন মনে হবে তখন আসলে সেই দেশের মানুষদের গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন,/ তাই রাজনৈতিক ভাবে দেশভাগের শিকার এই সমস্ত দেশের মানুষেরা যদি এই তিন দেশের কোনোটিতে চলে যান তবে তাঁদের শরণার্থী নয় বরং উদ্বাস্তু হিসাবে গণ্য করা উচিৎ এবং তাঁরা নিঃশর্ত নাগরিকত্বেরও দাবিদার।

পাকিস্তান এই উদ্বাস্তুদের খুব সহজে নাগরিক হিসাবে  মেনে নিলেও, ভারত সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ভারত সরকার অবিভক্ত  ভারতের উদ্বাস্তদের নিঃশর্ত নাগরিকত্বের দাবি মেনে নেয়নি। বরং তাঁদের শরণার্থী  আর অবৈধ অভিবাসীর তকমা দিয়েছে। উদ্বাস্তু আর শরণার্থী শব্দ দুটো গুলিয়ে দিয়েছে।

অখণ্ড ভারতের সন্তানরা খণ্ডিত ভারতে শরণার্থীর বদলে উদ্বাস্তু হিসাবে  চিহ্নিত হওয়ার এবং নিঃশর্ত নাগরিকত্ব পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু অখণ্ড ভারতের সন্তান অর্থাৎ বাংলাদেশী ও পাকিস্তানিদের থেকে আইনত নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের বর্তমান ভারতে সুযোগ সুবিধা এবং অধিকার বেশী। নেপাল বা ভুটানের নাগরিকরা ভারতে আসলে তাদের পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে আসতে হয়না। কিন্তু পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে গরিব মানুষেররা এই দেশে বিনা ভিসা পাসপোর্টে এলে তাঁদের “অবৈধ অভিবাসী” বা অমিত শাহের ভাষায়  “ঘুসপেঠিয়া” তকমা পেয়ে জেলে থাকতে হয়!

পাকিস্তানের সাথে না হয় একাধিক যুদ্ধ হয়েছে, দেশটি শত্রুদেশ হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ হলেও, ৭১ সালের পরেতো বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্রই ছিলো এত দিন! তবে সীমান্তে চলাচলে বাধা কেন? কেন সীমান্তে অমানবিক হত্যার অভিযোগ ওঠে বার বার। এর কারণ খুজতে হবে বাঙালির জাতিগঠনের ইতিহাসে। সেই বিষয়ে অন্য পর্বে আলোচনা করা যাবে।

বাঙালি নির্যাতনের ময়নাতদন্ত

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *