অমৃতকালে জনগণের টাকায় কর্পোরেট মোচ্ছব – সুমন কল্যাণ মৌলিক

শেয়ার করুন

মিডিয়ার সৌজন্যে খবরটা ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছেন। মোদি সরকারের প্রিয়পাত্র শিল্পপতি অনিল আম্বানি ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। ঋণ খেলাপী অনিলকে বাঁচাতে মাঠে নেমে পড়েছে সরকারি মেশিনারি। মাত্র ২৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এই পর্বতপ্রমাণ ঋণ মকুব করা হয়েছে। সংবাদে প্রকাশ এই খুলে আম জালিয়াতিতে ‘তাজ্জব’ হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই অমৃতকালে অবশ্য কর্পোরেট হাঙরদের লুঠতরাজ দেখে অবাক হওয়া ছাড়া আদালতের আর কোন কাজ অবশিষ্ট নেই। অবশ্য এই ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন নয়। ঋণ মকুবের নামে দেশের মানুষের ঘাম রক্তের টাকা কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা ধারাবাহিক এবং এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলোর আর্থিক অবস্থা আজ অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। আর এই অনিল আম্বানি অবশ্য গভীর জলের মাছ। রাফাল কেলেঙ্কারি হোক বা সাম্প্রতিক সময়ে দুনিয়া কাঁপানো কেচ্ছা এপস্টিন ফাইলের ভারতীয় যোগ– সাধারন যোগসূত্র হল অনিল আম্বানি।

এই সংকটের স্বরূপ আমাদের কারোর অজানা নয়।এবছরেই মে মাসে আরেকটি প্রতিবেদনে আমরা নজর ফেরাতে পারি। সরকারি – বেসরকারি নির্বিশেষে সমস্ত ব্যাঙ্কেই ঋণ তামাদি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভয়ঙ্কর ভাবে বাড়ছে। ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার ২০২৪ সালের আর্থিক বর্ষে এই ঋণ মুছে দেওয়ার (write off) পরিমাণ ছিল ১৭,৬৪৫ কোটি টাকা যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৬,৫৪২ কোটি টাকা। ঐ একই সময় পর্বে আইসিআই ব্যাঙ্কের ৯,২৭১ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৬,৮৯১ কোটি টাকা। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ৮,৮৬৫ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১১,৮৩৩ কোটি টাকা।( তথ্যসূত্র: Banks clean unsecured book with aggressive write off in FY 25/ Piyush Suda / May 27,2025/ Hindu business line)।

আলোচনার গভীরে প্রবেশের আগে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দুটো বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার।প্রথমটি হল ‘ Waive-off’ (ঋণ মকুব) এবং দ্বিতীয়টি হল আমাদের আলোচ্য ‘write-off’ ( হিসাবের খাতা থেকে ঋণ মুছে ফেলা কারণ এগুলো চরিত্রগত ভাবে ব্যাড লোন)। ঋণ মকুবের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে বাকি থাকা ঋণ শোধ দিতে হয় না। এই ঋণ ক্যানসেল করা হয় ব্যাঙ্কের তরফ থেকে এবং ঋণ গ্রহীতার বিরুদ্ধে কোন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা যদি জামানত হিসাবে কোন কিছু দেয় তবে তিনি তা ফেরত পান। এই মকুবের সিদ্ধান্তে সরকারের মুখ্য ভূমিকা থাকে। অন্যদিকে ঋণ মুছে ফেলা বলতে বোঝায় এখানে ঋণদাতা (ব্যাঙ্ক) তার ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে ঋণ অবলেপন করে কিন্তু এর অর্থ ঋণ ক্যানসেলেশন নয়। ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা জারি থাকে। ঋণ নেওয়ার সময় গ্রহীতার দেওয়া জামানত ব্যাঙ্ক বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই তুলনা উল্লেখ করার কারণ উদ্ধারের চেষ্টা কতটা ফলদায়ক হচ্ছে তাও আমাদের বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে। (তথ্যসূত্র: Difference between loan ‘write-off’ & ‘waive-off’/moneyview.in)।

পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনার নিরিখে আমরা যদি ঋণের অবলেপন (write off) ও তার উদ্ধারের ছবিটা জানতে চাই তাহলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রদত্ত তথ্যের দিকে নজর ফেরাতে হবে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো মুছে ফেলেছে ১০.৪২ লক্ষ কোটি টাকা কিন্তু আদায় করতে পেরেছে মাত্র ১.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। তাই বলা যায় ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে নন পারফর্মিং অ্যাসেট এবং অনাদায়ী ঋণের সমস্যা প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। এই মুছে ফেলার পরিমাণ বেড়েছে ৫৯%। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুসারে এই ঋণ অবলেপন সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০১৯ সালে,পরিমাণ ১,৮৩,২০২ কোটি টাকা। আর সেই ঋণ আদায় সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০২৩ সালে, পরিমাণ ৩৫,৩৭৮ কোটি টাকা। ঋণ মুছে ফেলে দেওয়ার তালিকায় প্রথম পাঁচটি ব্যাঙ্ক হল ১. স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (২,৮৬,১৪৪ কোটি টাকা) ২.পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক (১,০৫,৪৭৮ কোটি টাকা), ৩.ব্যাঙ্ক অব বরোদা ( ৯২,১৭৪ কোটি টাকা), ৪.ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ( ৭৮,১৯৪ কোটি টাকা), ৫.ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (৬২,৫৩৭ কোটি টাকা)। এই ঋণ উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচটি ব্যাঙ্ক হল — ১.স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (৫৪,৪৮১ কোটি টাকা),২.পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক (২৩,৭৭৯ কোটি টাকা), ৩.কানাড়া ব্যাঙ্ক (১৫,০৫৪ কোটি টাকা),৪.ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ( ১৩,০২৬ কোটি টাকা),৫.ব্যাঙ্ক অব বরোদা ( ১২,৩০৫ কোটি টাকা)। [ তথ্যসূত্র: Rs 10.4 lakh cr NPAs, 9 years: Which banks wrote off,recovered how much/ Newslaundry,1 march,2024]।

আজকাল ভারতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলির সৌজন্যে বিভিন্ন ‘ মানি হেস্ট’ সিরিজ জনপ্রিয়। কিন্তু এদেশে এই হেয়ার কাটের মাধ্যমে কিভাবে কর্পোরেট হাঙররা জনগনের লক্ষ কোটি হস্তগত করছে তার কাহিনী কম নাটকীয় নয়। এই পর্বে আমরা কিছু নির্দিষ্ট উদাহরণ আলোচনা করব। এক্ষেত্রে প্রথম উদাহরণটি হল অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। এই কোম্পানির মোট ঋণ ছিল ৪৭,২৫০ কোটি টাকা। সম্পদের মধ্যে ছিল ৪৩,৫০০ টি টাওয়ার এবং ১,৭০,০০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিক। একটা টাওয়ারের ইনস্টলেশন খরচ আনুমানিক ২৫ লাখ টাকা এবং জমির বিভিন্নতা অনুসারে এক কিলোমিটার ফাইবার অপটিক বসানোর খরচ গড়ে ৬,০০০ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই কোম্পানিকে নীলামে ওঠানোর পর অনিল আম্বানির দাদা মুকেশ আম্বানি মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকার বিনিময়ে এই কোম্পানি দখল করলেন। ব্যাঙ্ক হেয়ারকাটের হার ৯৯.১১%। অভাবনীয় কিন্তু সত্য। (তথ্যসূত্র: Corporate Bailouts and public Burden: The hidden truth of Loan Haircuts/ S S Anil/the kanal.in)।

দ্বিতীয় উদাহরণটি মোদি ঘনিষ্ঠ আরেক কর্পোরেট আদানি গ্রুপ। দশটি ঋণগ্রস্ত কোম্পানির মোট ব্যাঙ্ক ঋণ ছিল ৬২,০০০ কোটি টাকা। এই অবস্থায় আসরে নামেন গৌতম আদানি। আদানি গ্রুপ কোম্পানিগুলোকে নিয়ে নেওয়ার পর ১৬,০০০ কোটি টাকা ব্যাঙ্কগুলোকে দিয়ে দায়মুক্ত হন। এক্ষেত্রে হেয়ারকাট অর্থাৎ ছাড়ের পরিমাণ ৭৪%। কোম্পানিগুলোর নাম ও আদানির কোন সংস্থা তাদের কেনে সেই তালিকা এখানে দেওয়া হল: ১.এইচডিআইএল ( আদানি প্রপার্টিজ) ২.র‍্যাডিয়াস এস্টেট ও ডেভলপারস ( আদানি গুডহোমস) ৩. ন্যাশানাল রেয়ন কর্পোরেশন ( আদানি প্রপার্টিজ) ৪. এসার পাওয়ার এমপি লিমিটেড (আদানি পাওয়ার) ৫. দিঘি পোর্ট লিমিটেড (আদানি পোর্ট অ্যান্ড সেজ লিমিটেড) ৬. ল্যানকো অমরকন্টক পাওয়ার (আদানি পাওয়ার) ৭. কোস্টাল এনজেন লিমিটেড (আদানি পাওয়ার) ৮.আদিত্য এস্টেটস (আদানি প্রপার্টিজ) ৯.কারালিকাল পোর্ট (আদানি পোর্ট অ্যান্ড সেজ) ১০.কোরবা ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি (আদানি পাওয়ার)। ( তথ্যসূত্র:Company bought over by Adani group got massive haircuts on loan ( the wire.in)

তৃতীয় উদাহরণটি হল লোকসভায় আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং এর পেশ করা তালিকা যা হেয়ার কাটের নামে ঋণ মকুবের খেলাটাকে একেবারে নগ্ন করে দেয়। সঞ্জয় সিং সেই ৪৩ কোম্পানির নাম সংসদে প্রকাশ করে দেন যারা সরকারের পলিসিকে ব্যবহার করে ৩,৫৩,৬৫৫ কোটি টাকা মকুব করে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি কোম্পানির নাম এখানে উল্লেখ করা হল– ১. রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজ(৩৬,৮১৯ কোটি টাকা), ২. ল্যানকো থার্মাল পাওয়ার লিমিটেড (৩৩,১৯৫ কোটি টাকা), ৩.দিভা হাউসিং ফিনান্স লিমিটেড (৪৯,২২২ কোটি টাকা) ৪. ভূষণ পাওয়ার অ্যান্ড স্টিল লিমিটেড (২৭,৯০৮ কোটি টাকা), ৫.অলোক ইন্ড্রাস্ট্রিজ ( ২৪,৪৭১ কোটি টাকা)।( তথ্যসূত্র: aamaaadmiparty.org/press release)।

ভারতের মত দেশে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাঁচতে বাধ্য হন,যেখানে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মধ্যেকার সীমারেখা নেহাৎই ভঙ্গুর সেখানে এই ধরণের তামাদি ঋণ (bad loan) এক সার্বিক বিপর্যয়। বিভিন্ন ব্যাঙ্ককে একীকরণ,তামাদি ঋণকে জামানত হিসাবে ব্যবহার করা আসল সত্যটাকে অস্বীকার করে। সেই সত্যটা হল কিভাবে এই পর্বত প্রমাণ ঋণ দেওয়া হল, কাদের দেওয়া হল এবং সেই দেওয়ার প্রক্রিয়াটাকে প্রশ্ন না করা। এই সমস্যার সমাধান বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হল কর্পোরেট লুঠকে মান্যতা দেওয়া। এমনিতে বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঋণের সাপেক্ষে নন পারফর্মিং অ্যাসেটের পরিমাণ ২০২২ সালে ১০% যা ২০১৭ সালে ছিল ৬.১%।এই হিসাব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। চিনের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১% মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন,ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা — প্রত্যেকের ৫% এর নিচে। ভারতে এই ঋণ শোধ না করার পরিমাণ উদ্বেগজনক ভাবে বাড়তে শুরু করে নব্বই এর দশকে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় থেকে। ধারাবাহিক ভাবে বিভিন্ন ধরণের আর্থিক বিপর্যয়ের ঘটনা মোদি জমানায় তামাদি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে চলেছে। নন- ব্যাঙ্কিং ফিনান্স সেক্টরে আইএলঅ্যান্ডএফএস ( IL&FS) এর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া আমাদের ঋণ ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাকে সামনে আনে। আমাদের দেশে রিয়েল এস্টেট ও ক্যাপিটাল মার্কেটে যত ব্যাঙ্কের ঋণ বেড়েছে তত বেড়েছে ঋণ শোধ না করার ঘটনা। মনে রাখতে হবে একটা তামাদি ঋণ (bad loan) শুধু ব্যাঙ্কের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে না, তার ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশেষ করে কৃষক,ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তরা। এটা সবার জানা যে ব্যাঙ্ক যখন কাউকে টাকা ধার দেয় তখন তার মধ্যে রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে, সেই রিস্ককে যতটা সম্ভব কমানোর জন্য নানান ধরণের ব্যবস্থা থাকে। একটা ক্ষুদ্র ঋণ তামাদি হয়ে গেলে ব্যাঙ্কের আর্থিক ক্ষতি নগন্য কিন্তু একটা বড়ো মাপের ঋণ তামাদি হলে ব্যালেন্স শিটে প্রভাব ফেলে। আজ তাই হিসাবের খাতা থেকে তামাদি হয়ে যাওয়া ঋণকে মুছে ফেলে (write-off) সমস্যার সমাধান হবে না, প্রয়োজন এই কর্পোরেট লুঠ বন্ধ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কর্পোরেট অনুগত সরকারগুলো সে কাজ করবে না,তা বলাই বাহুল্য। ( তথ্যসূত্র: Is RBI’s New Plan for Bad loans just another Quick fix?/ pranayv raj/ the wire/may 24,2025)

সুমন কল্যাণ মৌলিক

প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *