যেভাবে নির্বাচন কমিশন অপরাধী তৎপরতা চালাচ্ছে – সৌম্য মন্ডল
রাজনৈতিক দল গুলোর বিরুদ্ধে ছাপ্পা, রিগিং, ভোট কারচুপির অভিযোগ ভারতে নতুন কিছু নয়, এমনকি নির্বাচনে বৃহৎ পুঁজির অংশগ্রহণ কীভাবে সংবিধানে যে কোনো নাগরিকের নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকারকে ঠাট্টায় পরিনত করছে, সেই নিয়েও আলোচনা হচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের আমলে যা হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। এর আগে নির্বাচন কমিশন অভিযুক্ত হয়েছে বিভিন্ন দলের ভোট জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য, কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন নিজেই জালিয়াতি করছে, এমন অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ।
সংসদে বিরোধী রাহুল গান্ধীর উত্থাপিত প্রমাণ গুলোর কথা আপনারা জানেন। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান নির্বাচনে কমিশনের বহু আপত্তিকর কার্যকলাপের মধ্যে দুটি উল্লেখ করবো- এই নির্বাচন কমিশন লাখ লাখ মানুষকে বিচারাধীন তকমা দিয়েছে। ভোটার আগে বিচারের নিষ্পত্তি না হলে এই ভোটারদের ভোট দিতে দেওয়া হবে না! অথচ আন্তর্জাতিক ভাবে এমনকি ভারতেও বিচারের মূল নীতি হল “অপরাধী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তি নির্দোষ” এবং “অপরাধী বেঁচে গেলে যাক, কিন্তু একজনও নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায়”। অথচ অযোগ্য প্রমাণিত না হওয়ার আগেই যদি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে কী এটা নিরপরাধের প্রতি হওয়া রাষ্ট্রীয় অপরাধ নয়?
ব্যাপক মানুষের ডিলিট এবং বিচারাধীন হওয়ার অন্যতম দুটি কারণ হল ১) ভোটারের নাম এবং তার অবিভাবকের নাম এর ভুল নথিভুক্তিকরণ। এই ভুল নথিভুক্তিকরণে ভোটারের কোনো দোষ আছে? নির্বাচন কমিশনের ভুলে ভোটার কেন শাস্তি পাবে? নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে এ কোন গণতন্ত্র?
২) ফর্ম ৭ এর মাধ্যমে কোনো ভোটারের নামি ডিলিট করার অভিযোগ করা যায়। কিন্তু আইন বলছে একজন ৫টার বেশি ফর্ম ৭ জমা করতে পারে না বা ৫ জবের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারে না। শুধু তাই নয় মিথ্যা অভিযোগও জানাতে পারেনা। মিথ্যা ফর্ম ৭ বা ৫ এর বেশি ফর্ম৭ জমা দিলে, যে অভিযোগকারী দিচ্ছে এবং যে আধিকারিক নিচ্ছে উভয়েরই বিরুদ্ধেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ধারা 248/230/227/229/354/196 অনুযায়ী FIR হওয়ার কথা। বিজেপি কর্মীরা বিভিন্ন বিধান সভায় দশ বারো হাজার করে ফর্ম ৭ জমা করেছেন, এক জন ৬০/৬৫টা করে ফর্ম৭ জমা করেছেন। কিছু যায়গায় ফর্ম ৭ জমা করতে গিয়ে বিজেপি কর্মীরা বিরোধীদের হাতে মার খেয়েছেন, সেখান থেকে কিছু তথ্য ফাঁস হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ফর্ম ৭ নিয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। তথ্য না দিলে আইন অনুযায়ী FIR হবে কীভাবে? অন্যদিকে সূত্র বলছে এবার বেআইনি এবং অলিখিত ভাবে “যত পারো ফর্ম৭ জমা নাও” এমন নির্দেশ এসেছে নির্বাচন কমিশনের উপর মহল থেকে। বলাবাহুল্য ফর্ম ৭ এর মাধ্যমে বিজেপি তার বিরোধী ভোটারদের বুথ স্তরে বেছে বেছে নিশানা করেছে। যদি ভুয়ো ফর্ম ৭ এর তথ্য নির্বাচন কমিশন দেয় তবে বিজেপি কর্মী এবং বিজেপিপন্থী BLO/ERO এর একটা বড় অংশ ভোটের আগে জেলে থাকবে।
স্পষ্টতই নির্বাচন কমিশন ফর্ম ৭ এর তথ্য চেপে অপরাধীদের আড়াল করছে। অন্যদিকে নিরীহ নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা, হয়রানির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এবারের নির্বাচন কমিশন যেন জনবিরোধী অপরাধমূলক প্রক্তিয়া চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে মোদী সরকার যে নতুন আইন বানিয়েছে, তা না বদলালে প্রত্যেক নির্বাচনই এইরকম জন বিরোধী হয়ে উঠবে বলা বাহুল্য।

সৌম্য মন্ডল
গবেষক ও প্রাবন্ধিক

