SIR ও নথি হারানো মেয়েরা: ভোটাধিকার কি আবারও চলে যাবে মেয়েদের? – ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী
SIR বা Special Intensive Revision নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—এই প্রক্রিয়াটি কি বাংলার অর্ধেক নাগরিক, তথা মেয়েদের কথা ভেবেছে আদৌ?
প্রথমত, স্কুলশিক্ষায় মেয়েদের ড্রপ-আউট রেট এখনও ছেলেদের তুলনায় বেশি। অনেক মেয়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছতেই পারে না—অর্থনৈতিক সমস্যা, অল্প বয়সে বিয়ে বা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তাদের পড়াশোনা থেমে যায়। তাহলে প্রত্যেক মেয়ের কাছে মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট থাকবে এটা ধরে নিলে স্বাভাবিকভাবেই বহু নারী সমস্যায় পড়বেন।
দ্বিতীয়ত, এখনও আমাদের সমাজে মেয়ের জন্ম সব পরিবারে সমান আনন্দের ঘটনা নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্ম শংসাপত্র (birth certificate) সংরক্ষণ করা হয় না। ছেলের কাগজ যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়, কিন্তু মেয়ের কাগজ হারিয়ে গেলে সেটি নিয়ে অনেক পরিবারই ততটা গুরুত্ব দেয় না।
তৃতীয়ত, বিয়ের পরে নাম ও পদবি বদলে যাওয়ার বিষয়টি। বাংলায় বহু মেয়ের বিয়ের পর পদবি বদলে যায়, অনেক সময় নামও বদলে দেওয়া হয়। স্কুলজীবনে যার নাম ইলা সেন বিয়ের পর তার নাম দেবযানী বাগচী হয়ে গেল—সমাজে এটি খুব স্বাভাবিক হলেও নথি যাচাইয়ের সময় এগুলোকে অনেক সময় “ডিসক্রিপেন্সি” বলে ধরা হচ্ছে, ফলে একজন সাধারণ নারী অকারণে সন্দেহের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।
চতুর্থত, মুসলিম মেয়েদের ক্ষেত্রে আরেক ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অনেক অবিবাহিত মুসলিম মেয়ের নামের আগে “মোসাম্মত” বা সংক্ষেপে Mst. লেখা থাকে—যেমন “Mst. Amina Khatun”। কিন্তু অনেক BLO এই সাংস্কৃতিক ব্যবহার সম্পর্কে জানেন না। ফলে কোথাও “Mst. Amina Khatun” আর অন্য কাগজে শুধু “Amina Khatun” থাকলে সেটিকে নামের অমিল হিসেবে ধরা হচ্ছে।
পঞ্চমত, বিয়ের পর মেয়েরা প্রায়ই নতুন ঠিকানায় চলে যায়, কিন্তু সব নথি একসঙ্গে আপডেট করা সহজ হয় না। তাই ভোটার কার্ড, আধার বা অন্য কাগজে আলাদা ঠিকানা থেকে যায়।
তার ওপর সুন্দরবনের মতো এলাকায় আয়লা, ইয়াসের মতো দুর্যোগে বহু মানুষের বাড়িঘর ও কাগজপত্র ভেসে গেছে। এরা আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা। এদের সুরক্ষা ও বৈধতা দেওয়াই রাষ্ট্রের কাজ।
তাই একটি সরল যুক্তি মনে রাখা দরকার—যে নিয়ম সমাজের পক্ষপাত বোঝে না, তা সবচেয়ে বেশি আঘাত করে মেয়েদের ওপর। কাজেই SIR মেয়েদের জন্য দ্বিগুণ বিপর্যয়।

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী
অধ্যাপিকা, বিভাগীয় প্রধান (ইংরেজি সাহিত্য),
প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ

