বাঙালি বিরোধী আইন- কে নাগরিক কে নয় – সৌম্য মণ্ডল

শেয়ার করুন

বাঙালি নির্যাতনের ময়নাতদন্ত – পর্ব ৫

আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা আসে নাগরিকের কাছ থেকে। প্রাক আধুনিক যুগে রাষ্ট্রের বৈধতা আসতো ঈশ্বর বা ধর্মের কাছ থেকে। রাজার ছেলে রাজা হত। তাকে ধর্ম বৈধতা দিতো। রাজার রাজত্বে প্রজার বাস। প্রজার জীবন রাজার মহানুভবতার উপর নির্ভরশীল ছিলো। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রজা হয়ে উঠলো সম-অধিকার সম্পন্ন নাগরিক। সকল নাগরিক আইনিভাবে সমান অধিকার সম্পন্ন। যদিও আর্থিক বৈষম্যের সমাজে রাজনৈতিক সাম্য আদৌ প্রকৃত প্রস্তাবে সম্ভব কিনা সেই নিয়ে মার্কসবাদীরা প্রশ্ন তোলেন। তবুও আমরা সেই বিতর্কে না গিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়টাকে মেনে নেবো।

আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকেরা শাসকের দয়ার পাত্র নয়, শাসকের কাছ থেকে সে বৈধতা দেয় না বরং ব্যাপারটা উলটো। নাগরিকেরা নিজেদের মধ্যে থেকে শাসক নির্বাচন করে। সেই শাসক নিজের খেয়াল খুশিমতো শাসন করতে পারে না। নাগরিকেরা নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করে, আইন প্রণয়ন করে, সেই সংবিধান এবং আইন অনুযায়ী শাসককে শাসন করতে হয়। শাসক যদি নাগরিকদের সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়, তবে আবার নাগরিকেরা শাসকে বদলে দিতে পারে৷ সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে আধুনিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রে রয়েছে নাগরিকের মর্যাদা।

কিন্তু বর্তমান ভারতে আমরা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি যেখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করতে হয়রান হতে হচ্ছে। দেশের নাগরিকদের তার দেওয়া করের টাকায় বেতন পাওয়া মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা রক্ষীরা ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকাচ্ছে বা ব্যাপক মারধর করে অন্যদেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে! এই সমস্ত কিছুর কিছু আইনি কারণ আছে এবং আছে কিছু ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক কারণ। আপাতত আমরা আইনি কারণ নিয়ে আলোচনা করবো। পরবর্তী পর্ব গুলোতে রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ নিয়ে আলোচনা হবে।

নাগরিকেরা যেহেতু সংবিধান রচনা করে, সেই সংবিধান অনুযায়ী যেহেতু দেশ চলে, তাই দেখে নেওয়া যাক কারা সেই নাগরিক? সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথম লাইনে উল্লিখিত “আমরা ভারতের জনগণ…”, কারা এই জনগণ? 

ভারতের সংবিধানের ৫(এ), ৫(বি) ধারা অনুযায়ী সংবিধান গ্রহণের আগে, ভারতে যারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তাদের ভারতে জন্ম হয়ে থাকলে, অথবা মা-বাবার মধ্যে অন্তত একজন ভারতে জন্মে থাকলে তারা ভারতের নাগরিক। ৫ (সি) অনুযায়ী যারা সংবিধান গ্রহণের আগে অন্তত ৫ বছর ভারতে বসবাস করেছেন তারা ভারতের নাগরিক। ৬(এ), (বি) (i) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির অথবা কোনো ব্যক্তির বাবা-মায়ের, দাদু-ঠাকুমার মধ্যে অন্তত একজন যদি ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন এবং তিনি যদি পাকিস্তান ভুক্ত এলাকা (বর্তমানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) থেকে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই এর মধ্যে ভারতে এসে থাকেন, তবে তিনি ভারতের নাগরিক।

সুতরাং এই চার প্রকার মানুষ বাদে সবাই বিদেশি হিসেবে গণ্য হবেন। এই চার প্রকার মানুষই হলেন সংবিধানের ‘আমরা ভারতের জনগণ’ এবং ১৯৫১ সালের প্রথম নাগরিক পঞ্জীর নাগরিক। এদের বংশধরেরা ভারতের স্বাভাবিক নাগরিক। এর বাইরে যদি কেউ বিদেশ থেকে এসে থাকেন, তবে তিনি স্বাভাবিকভাবে আর ভারতের নাগরিক হয়ে যাচ্ছেন না। তাকে ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানাতে হবে, সেই আবেদন সরকার মঞ্জুর করলে তবেই তিনি ভারতের নাগরিক।

কিন্তু এতো হল সংবিধান গ্রহনের আগে কারা ভারতের নাগরিক, সংবিধান গ্রহনের পর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারির পর কারা ভারতের নাগরিক হতে পারে? অবশ্যই সেটা ঠিক করার অধিকার পার্লামেন্টের।

১৯৫৫ পার্লামেন্টে গৃহীত হয় ভারতের প্রথম নাগরিক আইন। এই আইন অনুযায়ী ভারতের মাটিতে, দূতাবাসে, জাহাজে বা উড়োজাহাজে জন্মেছে এরকম যে কেউ ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।

এরপর কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৮৬ সালে আইনটি সংশোধন করেন। এই সংশোধনে বলা হয়, ভারতে জন্মালেই কেউ আর ভারতীয় হয়ে যাবে না। শিশুর মা-বাবার মধ্যে অন্তত একজনকে ভারতের বৈধ নাগরিক হতেই হবে। এই আইনটি ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকরী।

 ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী আইনটিকে সংশোধন করে বলেন ভারতে জন্মালেই হবে না, তার সাথে মা বাবার মধ্যে একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতেই হবে। এই আইনটি লাগু হচ্ছে ১জুলাই ১৯৮৭ থেকে।

২০০৩ সালে বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ী নাগরিক আইনটিকে আবার সংশোধন করেন। সংশোধনে বলা হয়, ভারতে জন্মানো শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যে একজনও যদি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হয়, তবে শিশুটি নাগরিকত্ব পাবে না। অর্থাৎ বাবা মায়ের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিক হলেও সমস্যা নেই। কিন্তু অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হলে চলবে না। ভারতের নাগরিক আইনের ৩নং ধারায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে এই ভাবে লেখা হয়েছে- 

(১) উপধারা (২)-এ যা বলা হয়েছে তা ছাড়া, ভারতের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি নাগরিক বলে গণ্য হবেন—

(ক) ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখের পর এবং ১ জুলাই, ১৯৮৭ তারিখের আগে জন্মগ্রহণ করলে;

(খ) ১ জুলাই, ১৯৮৭ তারিখের পর এবং Citizenship (Amendment) Act, 2003 (২০০৪ সালের আইন নং ৬) কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করলে, এবং যার পিতা বা মাতার যে-কোনো একজন তার জন্মের সময় ভারতের নাগরিক থাকলে;

(গ) Citizenship (Amendment) Act, 2003 কার্যকর হওয়ার পর জন্মগ্রহণ করলে, যেখানে—

  (i) উভয় পিতা-মাতা ভারতের নাগরিক; অথবা

  (ii) পিতা বা মাতার একজন ভারতের নাগরিক এবং অন্যজন তার জন্মের সময় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন,

তাহলে তিনি জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন।

এবার একটা উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। ২০২৫ এ যে শিশুটি জন্মালো সে কীভাবে ভারতের নাগরিক হবে? যেহেতু শিশুটির জন্ম ৩রা ডিসেম্বর ২০০৪ এর পর অর্থাৎ ক্যা (CAA) ২০০৩ কার্যকর হওয়ার পর, তার তার জন্য প্রযোজ্য নাগরিক আইনের ৩নং ধারার গ  উপধারা। সুতরাং এই শিশুটি যে ভারতে জন্মেছে তার প্রমাণ দিতে হবে, যা হল তার বার্থ সার্টিফিকেট এবং তার সাথে প্রমাণ করতে হবে শিশুটির মা এবং বাবা দুইজনাই ভারতীয় নাগরিক বা একজনও অবৈধ অভিবাসী নয়।

এবার এই শিশুটির মা-বাবা কীভাবে নাগরিক প্রমাণিত হবে? ধরাযাক এই শিশুটির মা-বাবার জন্ম ১৯৯০/৯২ সালে। সুতরাং তাদের জন্য প্রযোজ্য নাগরিক আইনের ৩নং ধারার খ উপধারা। অর্থাৎ নিজেদের ভারতে জন্মাবার প্রমাণ এবং তাদের মা বাবা মধ্যে একজন অন্তত ভারতের নাগরিক। অর্থাৎ ২০২৫ সালে শিশুটি নাগরিক তখনই প্রমাণিত হবে, যখন শিশুটির দাদু দিদার এবং ঠাকুরদা ঠাকুমার মধ্যে অন্তত একজন করে ভারতের নাগরিক প্রমাণিত হবে।

ধারা যাক শিশুটির দাদু দিদা এবং ঠাকুরদা ঠাকুমা জন্মেছে ১৯৬০ সালে। সুতরাং তাদের উপর প্রযোজ্য হবে ভারতের নাগরিক আইনের ৩নং ধারার ক উপধারা। তাদের শুধুমাত্র প্রমাণ করতে হবে যে তারা ভারতে জন্মেছেন। কিন্তু সমস্যা হল সেই সময় বার্থ সার্টিফিকেট আসেনি। তাহলে এবার কী হবে? এবার তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ তারদের পূর্বপুরুষ সংবিধান গ্রহণের আগে ভারতে বসবাস করতো তার প্রমাণ।

জন্মগত নাগরিকত্ব ছাড়াও ভারতের নাগরিক আইনের ৫নং ধারায় রেজিষ্ট্রেশন, (যেমন কেউ যদি কোনো ভারতীয়কে বিয়ে করে) এবং ৬নং ধারায় ন্যাচেরালাইজেশন (ভারতে ১১ বছর বাস করলে) এর আওতায় আবেদন করে নাগরিকত্ব পেতে পারে। এই আবেদন করে পাওয়া নাগরিকত্বের সার্টিফেকটও নাগরিকত্বের জোরদার প্রমাণ।

১৯৭১ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আগে পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের আবেদন করে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ ভারত সরকার রেখেছিল। কিন্তু সমস্যা হল অসচেতনতার কারণে বহু উদ্বাস্তু মানুষ আবেদনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন না করেই ভারতে রয়ে গেছেন। কিন্তু ১৯৭১ ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির পর (২৫ মার্চ) ভারত সরকার একজন বাংলাদেশিকেও নাগরিকত্ব দেয়নি। সুতরাং ১৯৭১ সালের আগে যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন তাদের অনেকে নাগরিক, আবার অনেকে নয় এবং ১৯৭১ সালের পর যারা ভারতে এসেছিলেন তাদের একজনও ভারতের নাগরিক নয়(২০২৪ সালের পর হাতে গোনা যে কয়জন ক্যা২০১৯ এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছে তারা বাদে)।

২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনি আইন অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মগত নাগরিকত্বের অধিকার শুধু কেড়ে নেয়নি, তার সাথে ৫ নং এবং ৬ নং ধারা অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব এবং ন্যাচেরালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থেকে অবৈধ অভিবাসীদের চিরতরে বাদ দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ অবৈধ অভিবাসী বা তাদের সন্তানরা আর কোনোভাবেই ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারে না। বিজেপির প্রচার যন্ত্র যাই বলুক না কেন, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনি আইন বাঙালি উদ্বাস্তদের আদৌ এই সমস্যার কোনো সমাধান করেনি। এই বিষয়ে আমরা অন্য পর্বে আলোচনা করবো।

যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে আপনি কতজন বাংলাদেশী মুসলিমকে চেনেন যারা ভারতে এসে থাকছে, তবে বেশির ভাগ জনই একজনও কেও চেনে না বলবে, কিছু মানুষ জানাবে যে তারা চেনে, সে একটা তিন অংকের সংখ্যাও বলে দিতে পারে। কিন্তু এর পর যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কতজন হিন্দুকে চেনেন যারা পূর্বপাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে থাকছে, তবে সংখ্যাটা বলা সমস্যার হবে, হয়তো তার গোটা গোটা শহর বা জেলার বেশিরভাগ মানুষই ঐপার থেকে আসা হিন্দু। সুতরাং এই অবৈধ নাগরিক বা অবৈধ অভিবাসী বা অমিত শাহের ভাষায় অনুপ্রবেশকারী “কিট পতঙ্গ”দের প্রায় পুরোটাই আসলে ওপার বাংলা থেকে আসা বাঙালি হিন্দু এবং তাদের সাথে যে ভারতের নাগরিকেরা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন তাদের সন্তানেরা।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *